২৭ মার্চ: একাত্তরের এই দিনে

২৭ মার্চ: একাত্তরের এই দিনে

উত্তরদক্ষিণ | শনিবার, ২৭ মার্চ, ২০২১ | আপডেট: ০৯:৫৫

আজ ২৭ মার্চ। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার খবর বিশ্ববাসী মূলত জানতে পারে একাত্তর সালের এই দিনে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ২৫শে মার্চ রাতের গণহত্যায় ঢাকা পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপ আর লাশের নগরীতে। ২৭ মার্চ সকালেও বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনে রমনা কালীমন্দিরে ২৭ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। ধারণা করা হয়, সেখানে শহীদদের বেশিরভাগই বাঙালি ইপিআর সদস্য। এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন শিথিল করে সামরিক কর্তৃপক্ষ।

এ দিনটি সম্পর্কে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিখেছেন, “…নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের সামনে পৌঁছেই রুমী হঠাৎ ‘ও গড!’ বলে ব্রেক কষে ফেলল। সামনেই পুরো কাঁচাবাজার পুড়ে ছাই হয়ে রয়েছে। এখনো কিছু কিছু ধোঁয়া উঠছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘মানুষও পুড়েছে। ওই সে পোড়া চালের ফাঁক দিয়ে…’ রুমী জোরে গাড়ি চালিয়ে-, ‘আম্মা তাকায়ো না ওদিকে’ বলে ডান দিকে মিরপুর রোডে মোড় নিল।”

“হাসপাতালের আউটডোরে গেটে ঢোকার আগে রুমী আরেকবার ‘ও গড!’ বলে ব্রেক কষে ফেলল। পাশেই শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলো গোলার আঘাতে ভেঙে দুমড়ে মুখ থুবড়ে রয়েছে। আমার দু’চোখ পানিতে ভরে গেল। একি করেছে ওরা!”

অসংখ্য মানুষকে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই বেঁধে নিয়ে রিক্সায় বা পায়ে হেঁটে ঢাকা শহর ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

এদিন ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। এদিনই বাঙালিদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দেয় ইন্ডিয়া। আকাশবাণীতে সীমান্ত খুলে দেওয়ার খবর জানার পর জনস্রোত ধাবিত হয় সীমান্ত অভিমুখে। ঢাকায় টানা ৩৪ ঘণ্টার হত্যাকাণ্ড শেষে করে এদিন পাকিস্তানের সেনারা ব্যারাকে ফেরে। পাকিস্তানের কোনো খবরে বাংলাদেশের ওপর এই বর্বরতার কথা প্রকাশ হয়নি। আর ঢাকায় কোনো পত্রিকাই প্রকাশিত হয়নি।

২৭ মার্চ বিবিসির খবরে বলা হয়, “কলকাতা থেকে প্রচারিত সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।” ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়, “ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।”

দিল্লির দ্য স্টেটসম্যান-এর প্রতিবেদনে লেখা হয়, “বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।”

দ্য গার্ডিয়ানের ২৭ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, “… ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে রেডিওতে ভাষণ দেয়ার পরপরই দ্য ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তার এই ঘোষণা অপর এক ব্যক্তি পাঠ করেন।”

এছাড়া ইন্ডিয়ার বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর প্রচার করা হয় এদিন। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস হেরাল্ডের ২৭ মার্চের সংখ্যার একটি খবরের শিরোনাম ছিল, “বেঙ্গলি ইনডিপেনডেন্স ডিক্লার্ড বাই মুজিব।” নিউ ইয়র্ক টাইমসেও শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়ার ছবি ছাপানো হয়। শিরোনাম লেখা হয় “স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শেখ মুজিব আটক।”

এদিন বার্তা সংস্থা এপি লেখে, “ইয়াহিয়া খান আবার সামরিক শাসন জারি করায় এবং আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।” আয়ারল্যান্ডের দ্য আইরিশ টাইমসের শিরোনাম ছিল- ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা’, সাথে ছিল শেখ মুজিবের ছবি। ব্যাংকক পোস্টের খবরে বলা হয়, “শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”

এদিন ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের জোর করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করিয়ে নেওয়ার পর বাঙালি শ্রমিকদের হত্যা করা হয়। তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী ‘৭১ এর দশমাস’, বিবিসি, জাহানারা ইমাম ‘একাত্তরের দিনগুলি

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading