তবে কী খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?
উত্তরদক্ষিণ| সোমবার, ২৩ আগস্ট ২০২১| আপডেট ১৮:২৫
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপের ফলে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ রয়েছে। টানা ১৭ মাস প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে শুধু যে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে তা কিন্তু নয় এর সঙ্গে ভয়ঙ্কর ভাবে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা। তবে প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে সম্প্রতি মিলেছে ইঙ্গিত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপের ফলে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ রয়েছে। প্রায় শব্দটি বলার কারণ হচ্ছে কিছু আবাসিক মাদরাসা (কওমি) মহামারির মধ্যেও নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নিকট অতীতে এতদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার নজির নেই। টানা প্রায় ১৭ মাস প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে শুধু যে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে তা কিন্তু নয় এর সঙ্গে ভয়ঙ্কর ভাবে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা। তবে গত বুধবার (১৮ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো খুলে দেয়ার তাগিদ দেন। তাতে মিলেছে ইঙ্গিতও।
গত বুধবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্কুলগুলোও দ্রুত খুলে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া দরকার এবং সেটা খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বলে না, আমাদের স্কুলগুলোও খোলা। এটা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাচ্চারা ঘরে থাকতে থাকতে তাদেরও যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে। সেই দিকে আমাদের নজর দেয়া দরকার।
একজন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যেভাবে তার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটাতে পারে সেটা পুরোপুরোই ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ফলপ্রসূ শিক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকণ্ঠিত হওয়ার যৌক্তিক কারণ তৈরি হয়েছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে সেশন জট, শিক্ষার চ‚ড়ান্ত লক্ষ্য (লার্নিং আউটকাম), বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কবে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমন প্রশ্ন এখন প্রতিটি অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমন্ডলীর মুখে মুখে। আদতে পরিস্থিতি কী বলছে? মহামারি করোনা ভাইরাসে প্রতিদিনই দেশে মৃত্যুবরণ করছে দেড়শ’র বেশি মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছে আট-দশ হাজার। সবশেষ পবিত্র ঈদুল আজহার আগে ও পরে টানা কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল গোটা দেশ। পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলেও জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে গত ১১ আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে সেই বিধিনিষেধ শিথিল করে সরকার। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নতুন করে কোনো আপডেট দেয়নি কেউই।
শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে এসে দ্রুতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এমনকি নভেম্বরে এসএসসি ও ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনাও করছেন তারা। সকল বিশ্ববিদ্যালয় গুলো খুলতে হলে আবাসিক এক লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সে কার্যক্রম শুরুও হয়েছে তবে তা পরিকল্পনার তুলনায় নিতান্তই ঢিমেতালে। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে শিক্ষকমন্ডলির কার্যক্রম।
পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষক শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনার পরই খুলবে প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সদস্য ড. ফেরদৌস জামান গণমাধ্যমে বলেছিলেন, গণটিকা কার্যক্রম শুরুর পর ব্যাপকভাবে টিকা পাচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ শিক্ষক টিকার আওতায় এসেছেন। এছাড়া নিবন্ধন করা দুই লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে অধিকাংশই টিকার আওতায় এসেছেন। তিনি আরও বলেন, আশা করছি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া সম্ভব হবে।
শিক্ষামন্ত্রী গণমাধ্যমে বলেছেন, দেশের সরকারি অধিকাংশ শিক্ষকমন্ডলিই টিকা কার্যক্রমের আওতায় চলে এসেছেন। বেসরকারি পর্যায়ের তিন লাখ ৬৩ হাজার ২২২ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে টিকা নিয়েছেন দুই লাখ ৭৮ হাজার ৪২৬ জন। বাকি আছেন প্রায় ৮৪ হাজার শিক্ষক। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ হাজারের বেশি শিক্ষক টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তাদের মধ্যে টিকা নিয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সব শিক্ষকই টিকা নিয়ে নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রতিবারই পরিস্থিতির অবনমন ঘটলে সেখান থেকে আমরা পিছিয়ে এসেছি। এখন করোনার যে সংক্রমণের হার, মৃত্যুরহার, সবকিছু মিলিয়ে যে অবস্থা, সেসব বিবেচনায় কবে নাগাদ আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারব সেটা বলার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা বলে নভেম্বর-ডিসেম্বরে সংক্রমণ অনেক কমে গিয়েছিল। এ বছরও যদি সেটা হয় তাহলে সে সময়ে আমরা ভেবেছি- এসএসসি ও এইচএসসির পরীক্ষা নিতে পারব ইনশাল্লাহ। সেই অনুযায়ী আমরা পরীক্ষার সময়সূচি ঠিক করেছি। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও খুলে দেয়া সম্ভব হবে। তবে সবকিছুই করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে শুধু যে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা কিন্তু নয়, এর পাশাপাশি চাকরি হারিয়েছেন বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও। আচমকা এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিকভাবে শূন্যের কোটায়ও চলে এসেছেন অনেকে। তাতে গণমাধ্যমে এমন সংবাদও দেখতে হয়েছে যে শিক্ষক এখন পরিচ্ছনতাকর্মী, সবজি বিক্রেতা, কৃষক, দিনমজুর। এছাড়াও প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এ খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও। যেমন মুদ্রণ, প্রকাশনা, স্টেশনারী দোকান, প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক গড়ে উঠা ছোট ছোট দোকান-পাটসহ নানা প্রতিষ্ঠান।
অনেকেই বলবেন অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রমতো চালু আছে, অসুবিধে কোথায়? আদতে আমাদের বাংলাদেশে কত শতাংশ লোক এই অনলাইন সুবিধে ভোগ করতে পারছে। কত শতাংশের কাছেই বা আছে অনলাইনে পাঠগ্রহণের ডিভাইস? হিসেব করলে দেখা যাবে সেটা নিতান্তই একটা শ্রেনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ আর শহর কেন্দ্রিক। গ্রামের সিংহভাগ মানুষই এখনও অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না। আর সেক্ষেত্রে প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্তীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
তবে যেহেতু করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বগতি এখনও চলমান সেহেতু পরিস্থিতিও বিবেচনা করা একান্ত দরকার। পাশাপাশি টিকা কার্যক্রম পুরোদস্তুর শুরু করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো সহসাই আবার প্রাণ পাবে। প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে ক্যাম্পাস, হাসি ফিরবে সবার মাঝে।
ইউডি/এজেএস

