গোয়েন্দা নজরদারিতে ৩০ প্রতিষ্ঠান: ই-কমার্স যেন ই-ফাঁস
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর ২০২১ । আপডেট ১২:৫০
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ই-কমার্স খাত। মহামারি করোনা এই খাতের পরিধি বাড়িয়েছে বহুগুণে। তবে সাম্প্রতিক ই-কমার্সের প্রেক্ষাপট বলছে যত গর্জে ততো বর্ষে না। আচমকাই যেনো এই খাতের সম্ভাবনার বিপরীত চিত্র দেখছেন গ্রাহকরা। সম্ভাবনার এই খাত যেনো দাঁড়িয়েছে বিষফোঁড়ায়। বিস্তারিত গাজী কাইয়ুমের প্রতিবেদনে…
ধীরে ধীরে যেনো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় খাত ই-কমার্স। এর মূলেই রয়েছে লোভ, প্রতারণা আর অর্থ আÍসাৎ। ইতোমধ্যেই এ খাতের তাক লাগানো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাঘব বোয়ালদের থলের ভেতরের খবর উঠে এসেছে এবং তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রতিদিনই ফাঁস হচ্ছে গোমড়, মিলছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাহকদের করা মামলার খবর। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও বসে নেই। তারাও গ্রেপ্তার করেই চলেছেন মামলায় সাব্যস্ত করা অভিযুক্তদের। শত শত কোটি টাকা আÍসাৎসহ গ্রাহক ও মার্চেন্টদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর বহু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতোমধ্যে দেশের ৬০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা করেছে এরমধ্যে ব্যবসার আড়ালে মানুষের অর্থ আÍসাৎ, অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা ও পণ্য না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এমন ৩০টি সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছে সংস্থাটি। গতকাল সোমবার (১১ অক্টোবর) সিআইডির সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার ইমাম হোসেন এ কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, মূলত গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতেই এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণার মূল ধরন হচ্ছে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি এবং সেই টাকা অগ্রিম গ্রহণ। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ সময় অতিবাহিত হলেও ওই পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে না পারা। পরবর্তীতে টাকা রিফান্ড করার কথা বলা হলেও তা আর না দেয়া। এভাবেই শত শত কোটি টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে নিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এসকল অভিযোগের ভিত্তিতেই গত ৩০ জুন ধামাকা শপিং এর ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়।
পরবর্তীতে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়। সেসময় শুধু ধামাকা শপিংই নয়, আলিশা মার্ট, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, কিউকম, দালাল প্লাস, ই-অরেঞ্জ এবং বাজাজ কালেকশনসহ ১১টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করে বিএফআইইউ। ইতোমধ্যে কারাগারে আছেন ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকমসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। তাদের বিভিন্ন ধাপে রিমাণ্ডে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যও পেয়েছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।
এদিকে, নতুন করে আরও চার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আগামী ১৭ অক্টোবরের মধ্যে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি উপস্থাপনের মাধ্যমে জবাব দিতে বলা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। মন্ত্রণালয়ের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, গত রবিবার (১০ অক্টোবর) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে ওই ৪টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- থলে, দালাল প্লাস, আনন্দের বাজার এবং অলসপার।
সূত্র জানায়, গ্রাহকদের প্রতারণার উদ্দেশ্যে অস্বাভাবিক অফার দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। নোটিশে বলা হয়, আগামী ১৭ অক্টোবরের মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি, গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে দায়ের পরিমাণ কত তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ওই দায় পরিশোধের লক্ষ্যে কোম্পানির সক্ষমতা রযেছে কি না, সেটি পরিষ্কার করতে এবং কোম্পানির চলতি সম্পদের হিসাব দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই ধারার প্রতিষ্ঠান ‘রিং আইডি’র মালিক কানাডা প্রবাসী শরিফ ইসলাম ও আইরিন ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাইবে সিআইডি। সোমবার সিআইডির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক কামরুল আহসান। সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২শ কোটি টাকা সিআইডির অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করেছে।
তবে রিং আইডির হাতিয়ে নেওয়া টাকার পরিমাণ আরও অনেক। সেই অর্থ কোথায় জমা আছে তা এখনো অজানা। গতকাল রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকার বড়গ্রাম এলাকা থেকে রিং আইডির একজন অন্যতম এজেন্ট মো. রেদোয়ান রহমানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটের মতো তারাও অস্বাভাবিক ডিসকাউন্টে বিভিন্ন প্রোডাক্ট বিক্রি এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে ই-ওয়ালেট এর মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনা করে আসছিলো। এছাড়াও গতকাল সোমবার অনলাইন টিকেটিং এজেন্সি টুয়েন্টি ফোর টিকিট ডটকমের বোর্ড অফ ডিরেক্টরের সদস্য মিজানুর রহমান সোহেলকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
পাশাপাশি থলে ডট কম ও উই কম ডট কমের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছেন তারা। কম দামে টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, বৈদ্যুতিক ফ্যানসহ বিভিন্ন পণ্যে ছাড়ে বিক্রির প্রলোভন দেখায় এরা। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন সঠিক নিয়মনীতির বাস্তবায়ন। একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করে এই খাতকে একটি মডেল খাত হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। কেননা সময়ের চাহিদার সঠিক যোগান দিতে ই-কমার্সই হতে পারে অর্থনীতির দৌড় ঘোড়া।

