একালের দুঃখিনী এক রাজকন্যার কাহিনী

একালের দুঃখিনী এক রাজকন্যার কাহিনী
Princess Mako, the elder daughter of Prince Akishino and Princess Kiko, and her fiancee Kei Komuro, a university friend of Princess Mako, smile during a press conference to announce their engagement at Akasaka East Residence in Tokyo, Japan, September 3, 2017. REUTERS/Shizuo Kambayashi/Pool

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১ । আপডেট ১২:৫১

ভালোবাসার মানুষের জন্য ছাড়তে হয়েছে রাজত্ব। পৃথিবীতে এমন ঘটনার সংখ্যা নেহাতই হাতেগোনা। ২০২১ সালে এসেও বিশ্ব দেখল ভালোবাসার এমনি এক অনন্য নজির। ঘটনাটি ঘটেছে জাপানের রাজকুমারী ও দেশটির বর্তমান সম্রাটের ভাতিজি মাকোর জীবনে। দীর্ঘদিনের প্রেমিক কেই কোমুরোকে বিয়ে করে রাজত্ব হারিয়েছেন একালের এই রাজকন্যা। দুঃখিনী সেই রাজকন্যার কাহিনী নিয়ে প্রতিবেদন, লিখেছেন মিলন গাজী

কলেজে থাকাকালীন সময়েই প্রেমের সম্পর্কের শুরু রাজকুমারী মাকো এবং প্রেমিক কেই কোমুরোর। গতকাল মঙ্গলবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এই জুটি। কিন্তু এই বিবাহই কাল হয়ে দাঁড়াল মাকোর জীবনে। বিবাহের পর পরই তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে নিজের রাজকীয় মর্যাদা, পদবী। ভালোবাসার টানে সবকিছু বিসর্জন দিতে পিছপা হননি মাকো। হাসিমুখেই ত্যাগ করেছেন সবকিছু। মূলত, জাপানি রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী, রাজপুত্র অথবা রাজকুমারীরা রাজবংশের বাইরে সাধারণ পরিবারের কাউকে বিয়ে করলে রাজকীয় পদমর্যাদা হারায় এবং রাজপ্রাসাদের সবকিছু থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হয়।

জাপানের গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বিয়ের রেজিস্ট্রি করার জন্য রাজকুমারী মাকো তার টোকিওর বাড়ি থেকে বের হন। বিয়ের পর নতুন স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন মাকো। সেখানে তিনি জানান, স্বামীর সঙ্গে সুখী একটি জীবন গড়ে তুলতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বলছেন, একসঙ্গে বসবাসের জন্য বিয়ে আমাদের কাছে খুই প্রয়োজনীয়।

বিয়ের পর মাকো এবং কেই কোমুরো আমেরিকায় সংসার পাতবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সেখানে আইনপেশায় যুক্ত আছেন কেই কোমুরো। এদিকে মেয়েদের বিয়ের পর প্রাসাদ ত্যাগের সময় উপহার হিসেবে তাদেরকে অর্থ দেওয়ার রীতিও চালু আছে জাপানের রাজপরিবারে। সেই অনুযায়ী, বিয়ের পর রাজপরিবার থেকে মাকোর পাওয়ার কথা ১০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। কিন্তু রাজপরিবার থেকে তিনি কোনো অর্থ নেবেন না বলে আগেই জানিয়েছিলেন মাকো। এর মাধ্যমে মাকোই জাপানের রাজপরিবারের প্রথম নারী সদস্য যিনি অর্থ, আচার-অনুষ্ঠান দুটোই পরিত্যাগ করলেন।

কোমুরো জানান, তিনি মাকোকে ভালোবাসেন এবং তার সঙ্গেই জীবন কাটাতে চান। তিনি বলেন, আমি মাকোকে ভালোবাসি। আমরা একটাই জীবন পাই, সে জীবনটা যেন আমরা ভালোবাসার কারও সঙ্গেই কাটাতে পারি। আইএইচএ-র বরাত দিয়ে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিটিভি জানিয়েছে, মাকো ও কোমুরোর বিয়ে সংক্রান্ত কাগজপত্র মঙ্গলবার রাজপ্রাসাদের এক কর্মকর্তা জমা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা অনুমোদিত হয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, মাকো ও কোমুরো প্রথমে ২০১৮ সালে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু পরে তা পিছিয়ে যায়।
জাপানের রাজতন্ত্র: ২,৭০০ বছর ধরে রাজ পরিবার শাসন করছে জাপান। রাজপরিবারের পোশাকি নাম হল ‘ইম্পিরিয়াল হাউস অফ জাপান’। খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৬৬০ সালে সম্রাট জিম্মু জাপানের রাজ বংশের সূচনা করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই একই রাজবংশের ১২৬ জন সম্রাট হয়েছেন।

বর্তমানে নারুহিতো ১২৬ নম্বর সম্রাট হিসেবে জাপানের আনুষ্ঠানিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। জাপানের বর্তমান রাজপরিবার আইন অনুযায়ী সম্রাটের পুত্র সন্তান একমাত্র পরবর্তী সম্রাট হতে পারবে। এবং পুত্রদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় হবে তারই সম্রাট হওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু বর্তমান রাজা নারুহিতোর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তার ভাই ফুমিহিতো এই মুহূর্তে যুবরাজ পদে আছেন। হিসেব মত জাপানের পরবর্তী সম্রাট হবেন ফুমিহিতো’র একমাত্র পুত্র হিসাহিতো। সত্যি বলতে জাপান রাজপরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে অবস্থান করছেন হিসাহিতো। জাপানের রাজপরিবারের কোনো কন্যা সন্তান যদি সাধারণ মানুষকে বিবাহ করেন তবে তিনি আর রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন না।

ইতিহাসে যারা ভালোবাসার টানে রাজত্ব হারিয়েছেন : ইতিহাস বলছে, প্রিয়জনের হাত ধরে অট্রালিকা ছাড়া, রাজপ্রাসাদ ছাড়া, এমনকি সম্রাটের সাম্রাজ্য ছাড়ার ঘটনাও আছে। অতি সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে মালয়েশিয়ায়। এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে ভালোবেসে দেশের অন্যতম ধনকুবের বাবার সম্পত্তির অধিকার হেলায় ছেড়ে দিয়ে ওই যুবকের সঙ্গে সংসার পেতেছেন ৩৪ বছরের এক নারী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ক্যারিবিয়ান বংশোদ্ভুত বিজ্ঞানী জেডিডাহ ফ্রান্সিসের প্রেমে পড়েন অ্যাঞ্জেলিনা। তখনই ঠিক করেন বিয়ে করবেন দু’জনে। কিন্তু মেয়ের এই সম্পর্কে ঘোর আপত্তি ছিল বাবা খু কে পেংয়ের। যিনি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন। এমনকি ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিচারে মালয়েশিয়ার সেরা ৫০ জন ধনকুবেরদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

বিট্রিশ সাম্রাজ্য ছেড়েছিলেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড: অষ্টম এডওয়ার্ড তখনো রাজা হননি। সুদর্শন এডওয়ার্ডের সঙ্গে পরিচয় হয় সুন্দরী ওয়ালিসের। প্রথম দেখায় এডওয়ার্ড প্রেমে মজলেও ওয়ালিস তখন দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করছেন। সামাজিক বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে প্রেমে জড়ালেন দুজনই। কিন্তু এ সম্পর্ক মানতে নারাজ রাজপরিবার। সিংহাসনে বসলেও কথা রটেছে দেশ-বিদেশে। ওয়ালিসকে বিয়ে করলে ছাড়তে হবে সিংহাসন। রাজা করলেনও তাই। সব ছেড়ে ফ্রান্সে পালিয়ে থাকা ওয়ালিসের কাছে ছুটে গেলেন অষ্টম এডওয়ার্ড। প্রেমের ইতিহাসে স্থাপিত হলো এক অনন্য নজির।

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading