ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতায় গুগল-ফেসবুক-ইউটিউব
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০১ নভেম্বর ২০২১ । আপডেট ০৭:৪৪
গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইয়াহু, অ্যামাজনসহ ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিগুলোর লেনদেন থেকে মূসক, টার্নওভার কর ও সম্পূরক শুল্ক এবং আয়কর প্রদানসহ সবধরনের রাজস্ব আদায় করতে সরকারের সাত সংস্থা ও দফতরকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে সরকারের ট্যাক্স-ভ্যাট-করের আওতাভুক্ত হতে যাচ্ছে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো।
আইনজীবীরা বলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। দেশের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পথ উন্মুক্ত হলো এর মাধ্যমে। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান আয়কর রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে নিয়মিত করের আওতাভুক্ত হতে যাচ্ছে। এখন থেকে বিশ্বখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধন করে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। যা দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য’ শীর্ষক জনস্বার্থে দায়ের করা এক মামলার রায়ে হাইকোর্ট এসব নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। গত বছরের ৮ নভেম্বর রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে এসব নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ এসেছে। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের ওই রায়ের ১৪৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ২৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর রিটের পক্ষের আইনজীবী হুমায়ন কবির পল্লব সারাবাংলাকে বলেন, ‘গুগল ফেসবুক, ইউটিউব, আমাজনসহ সবধরনের অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে এলেও ট্যাক্স-ভ্যাট-আয়কর না দেওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ দিন ধরে তারা তা দেয়নি। পরে ট্যাক্স-ভ্যাট-রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন যুক্ত করে জনস্বার্থে রিট দায়ের করি। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত রুল জারি করেন। পরে ২০১৯ সালে ৮ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ আদেশে আদালত বেশ কয়েকটি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রায়ে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইয়াহু, অ্যামাজনসহ ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নিবন্ধন নিতে হবে এবং নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় করল তা আদালতকে জানাতে হবে। এবং এই মামলাটি একটি চলমান আদেশ (Continuing Mandamus) হিসেবে অব্যাহত থাকবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করলে এর প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যাবে।’
আইনজীবী হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, ‘আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, তা হলো- এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর, টার্নওভার কর ও সম্পূরক শুল্ক, এবং আয়কর দেওয়াসহ সবধরনের রাজস্ব বকেয়াসহ প্রদান করবে। এটি বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী রায়। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। এর মাধ্যমে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পথ তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি।’
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবির সব চিঠিপত্র এবং অনলাইনে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট ও লেখা পর্যালোচনায় এটা কাচের মতো পরিষ্কার যে, গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইয়াহু, আমাজনসহ অন্যান্য ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিজ্ঞাপন, ডোমেইন বিক্রি, লাইসেন্স ফিসহ সবধরনের লেনদেন থেকে উৎসে কর, শুল্কসহ সবধরনের রাজস্ব প্রদান বাংলাদেশে করছেন না। যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাপক পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, সেহেতু গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইয়াহু, আমাজনসহ অন্যান্য ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মূসক, টার্নওভার কর ও সম্পূরক শুল্ক, ধারা ১৫ এর অধীন আরোপিত মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর প্রদান না করা বেআইনি।

