ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ; শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অতুলনীয় সম্রাট
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৫:২০
সুর সম্রাট আলউদ্দিন খাঁ প্রথম বাঙালী যিনি সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যে এই উপমহাদেশের রাগসঙ্গীতকে পরিচিত ও প্রচার করেন। অতি উচ্চমাত্রার সঙ্গীতকলাকার ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন। সেতার ও সানাই এবং রাগ সঙ্গীতে বিখ্যাত ঘরানার গুরু হিসেবে সারাবিশ্বে সুপরিচিত। মূলত সরোদই তার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাহন হলেও সাক্সোফোন, বেহালা, ট্রাম্পেটসহ আরও অনেক বাদ্যযন্ত্রে তার পারদর্শিতা ছিল। উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ওস্তাদ আলউদ্দিন খাঁ’কে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক।
সঙ্গীতশিল্পী পরিবারে বেড়ে উঠা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে বিখ্যাত এক সঙ্গীতশিল্পী পরিবারে ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর মাতার নাম ছিল সুন্দরী খানম। আলাউদ্দিনের ডাক নাম ছিল ‘আলম’। সঙ্গীতশিল্পী পরিবার জন্ম নেয়া আলাউদ্দিনের সঙ্গীতে ঝোঁক ছিল প্রবল। মূলত ছোটকালে নিজ পরিবারেই সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় তার। পরিবারের অন্যান্যদের মধ্যে তিনিও সঙ্গীতের আবহে বেড়ে উঠেন। তার ছোট ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁও উপমাহাদেশের আরেকজন অন্যতম সঙ্গীতজ্ঞ।
গৃহত্যাগ ও সঙ্গীত চর্চা
বাল্যকালে অগ্রজ ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁর নিকটে সঙ্গীতে আলাউদ্দিন খাঁ হাতে খড়ি হয়। সুরের সন্ধানে তিনি দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এক যাত্রা দলের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। ওই সময় তিনি জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি প্রভৃতি গানের সঙ্গে পরিচিত হন। অতঃপর কলকাতা গিয়ে তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধক গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তবে গোপাল কৃষ্ণ একটি শর্ত আরোপ করলেন আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণের সময় যে, কমপক্ষে বারো বছর এক নাগাড়ে সঙ্গীত সাধনা করতে হবে সেখানে থেকে। আলাউদ্দিন খাঁ রাজি হয়ে গেলেন আরোপিত শর্তে। কিন্তু সাত বছরের শেষ দিকে হঠাৎ প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন সঙ্গীত সাধক গোপাল কৃষ্ণ।
পিতৃহীনের মতো দুঃখ শোকে কিছুদিন পাথর হয়ে রইলেন আলাউদ্দিন খাঁ। ক্রমে ক্রমে শোকের ভার কমলে আকস্মাৎ কণ্ঠসঙ্গীত সাধনা ছেড়ে দিয়ে তিনি যন্ত্রসঙ্গীত সাধনায় নিজেকে নিমগ্ন করলেন। স্টার থিয়েটারের সঙ্গীত পরিচালক অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের নিকট তিনি বাঁশি, পিকলু, সেঁতাঁর, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জু ইত্যাদি দেশী-বিদেশী বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। সেসঙ্গে তিনি লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের নিকট পাশ্চাত্য রীতিতে এবং বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ অমর দাসের নিকট দেশীয় পদ্ধতিতে বেহালা শেখেন। এ ছাড়া হাজারী ওস্তাদের নিকট মৃদঙ্গ ও তবলা শেখেন। এভাবে তিনি সর্ববাদ্য বিশারদ হয়ে ওঠেন।
সঙ্গীত অভিন্ন চিন্তা করেননি তিনি
আলাউদ্দিন খাঁ কিছুদিন ছদ্মনামে মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা বাদকের চাকরি করেন। অতঃপর ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎ কিশোর আচার্যের আমন্ত্রণে তাঁর দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতে যান। সেখানে ভারতের বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁর সরোদ বাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর নিকট পাঁচ বছর সারোদে তালিম নেন। এরপর ভারত খ্যাত তানসেন বংশীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর নিকট সরোদ শেখার জন্য তিনি রামপুর যান। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁর সঙ্গীত গুরু ও দরবার সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর নিকট দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেনী ঘরানায় সঙ্গীতের অত্যন্ত দুরূহ ও সূক্ষ্ম কলাকৌশল আয়ত্ব করেন।
মাইহারের রাজা ব্রিজনাথ আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সঙ্গীতগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত করলে তিনি মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বেরিলির পীরের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রণোয়াম ও ধ্যান শেখেন। এভাবে জীবনের একটা বড় অংশ আলাউদ্দিন শিক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। অতঃপর শুরু হয় তাঁর কৃতিত্ব অর্জনের পালা। ১৯৩৫ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফল করেন। তখন তিনি ইংল্যান্ডের রানী কর্তৃক সুর সম্রাট খেতাবপ্রাপ্ত হন। তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের রাগসঙ্গীতকে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের নিকট পরিচিত করান যা, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি উদয় শঙ্কর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ‘কল্পনা’ শীর্ষক একটি ক্ল্যাসিক ধর্মী ছায়া ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
সৃষ্টিতে অন্যন্য আলাউদ্দিন
আলাউদ্দিন খাঁ সরোদে বিশেষত্ব অর্জন করেন। সহজাত প্রতিভা গুণে তিনি সরোদ বাদনে ‘দিরি দিরি’ সুরক্ষেপণের পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেঁতারে সরোদের বাদন প্রণালী প্রয়োগ করে সেতার বাদনেও তিনি আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবে তিনি সঙ্গীত জগতে এক নতুন ঘরানার প্রবর্তন করেন, যা আলাউদ্দিন ঘরানা, মাইহার ঘরানা নামে পরিচিতি লাভ করে।
আলাউদ্দিনের পরামর্শ ও নির্দেশে কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়। সেগুলির মধ্যে চন্দ্র সারং ও সুর শৃঙ্গার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক রাগ-রাগিণীও সৃষ্টি করেন, যেমন- হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, মেহ-বেহাগ, মদন মঞ্জুরি, মোহাম্মদ (আরাধনা), মানঝ খাম্বাজ, ধবল শ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চন্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি।
বহুসংখ্যক যোগ্য শিষ্য তৈরি তাঁর অপর কীর্তি। তাঁর সফল শিষ্যদের মধ্যে তিমির বরণ, পুত্র আলী আকবর খান, জামাতা পন্ডিত রবিশঙ্কর, ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর হোসেন খান, কন্যা রওশন আর বেগম (অন্নপূর্ণা), ফুলঝুড়ি খান, খাদেম হোসেন খান, মীর কাশেম খান, পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, পান্নালাল ঘোষ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পৌত্র আশীষ খান, ধ্যানেশ খান, খুরশীদ খান, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
প্রাপ্তির ঝুলি
১৯৩৫ সালে বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বের হন আলাউদ্দিন খাঁ। এ সময় ইংল্যান্ডের রানী তাকে ‘সুর সম্র্রাট’ খেতাব প্রদান করেন। তিনি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্টার স্টাইলে একটি যন্ত্রি দল গঠন করে নাম দেন ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’। অতঃপর ইন্ডিয়া সরকার তাঁকে একে একে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমী সম্মান (১৯৫২ খ্রিঃ)’, ‘পদ্ম ভূষণ (১৯৫৮ খ্রিঃ), ‘পদ্ম বিভূষণ (১৯৭১ খ্রিঃ)’, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দেশী কোত্তম (১৯৬১ খ্রিঃ)’, এবং দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৫৪ সালে তিনি ইন্ডিয়া সরকার কর্তৃক প্রথম সঙ্গীত নাটক একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল তাঁকে আজীবন সদস্য পদ দান করেন। এসব দুর্লভ সম্মান ও খেতাব সঙ্গীত বিদ্যায় আলাউদ্দিন খাঁর অসাধারণ কীর্তি ও সাফল্যকেই প্রমাণ করে।
উস্তাদের পরলোক গমন
উপমহাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গর্ব, তিতাস পাড়ের এই কৃতি সন্তান ১৯৭২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর মাইহার রাজ্যের ‘মদিনা ভবন’এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উপমহাদেশের আকাশের একটি ধ্রুবতারা চলে গেলেও মানব জাতিকে তিনি তার কর্মের মাধ্যমে দৃঢ় সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের অতুলনীয় শিক্ষা দিয়ে গেছেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ অমর হয়ে থাকবেন চিরদিন।
ইউডি/ অনিক

