সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার দূত মাদার তেরেসা

সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার দূত মাদার তেরেসা

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৭:৫০

মানবমুক্তি ও মানব কল্যানের মূর্ত প্রতীক মাদার তেরেসা প্রেম, শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীকী একটি নাম। নিপীড়ন, শোষণ ও নিষ্ঠুরতার হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার জন্য যে সকল সাধু মহাত্মা আজীবন অশেষ কষ্ট ভোগ করেছেন, অকাতরে প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছেন, মাদার তেরেসা তাদেরই শেষ উত্তরাধিকারী। মানবতার মমতাময়ী মাদার তেরেসাকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক

শৈশবে পিতৃহীন হন তেরেসা
তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের (বর্তমান মেসিডোনিয়া) একটি ছোট্ট গ্রাম স্কোপজে এক আলবেনিয় রোমান ক্যাথলিক কৃষক পরিবারে ১৯১০ খ্রিঃ ২৬শে আগস্ট মাদার তেরেসার জন্ম হয়। তার পিতার নাম নিকোলাস বোজাকসহিউ। তিনি মেয়ের নামকরণ করেছিলেন অ্যাগনেস গোনজহা জোকসহিউ। আলবেনিয়ার এই দরিদ্র দম্পতি কোনও দিন ভাবতে পারেননি তাদের অতি শান্ত কন্যাটি একদিন পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ মোচনের স্বপ্নকে রূপ দেবার জন্য নিজের জীবনকেই উৎসর্গ করবেন।

ছোট বয়সেই করুনাময় যিশু আর মাতা মেরির ছবির সামনে চোখ বন্ধ করে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে শক্তির প্রার্থনা করতেন। ঈশ্বরের কাছে এই নীরব প্রার্থনাই ছিল মাদারের যাবতীয় শক্তির উৎস। পরবর্তী জীবনেও যতই কাজ থাক প্রার্থনার সময়টি মাদার তেরেসা প্রায় সামরিক নিয়মের কঠোরতায় রক্ষা করেছেন। মাত্র সাত বছর বয়সে অ্যাগনেস পিতৃহীন হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যুগোস্লাভিয়ায় তার মা অনেক কষ্টে লালন পালন করেন তাদের। মায়ের প্রেরণাতেই দরিদ্রের প্রতি দয়া ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বিশ্বাস লাভ করেছিলেন অ্যাগনেস। অল্প বয়স থেকেই ধর্মীয় কাজকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন মাদার তেরেসা খ্যাত অ্যাগনেস।

শিক্ষাজীবনেই মানবতার ব্রত পান তেরেসা
স্কোপজের পাবলিক স্কুলে পড়বার সময়েই সোডালিটি সংঘের মিশনারিদের কাজকর্মের প্রতি মাদার তেরেসার মন আকৃষ্ট হয়। সংঘের পত্রপত্রিকাগুলিতে নিয়মিত ইন্ডিয়ার নানা খবর পড়তেন তিনি। স্কোপজে পাবলিক স্কুলের ক্লাসে যুগোস্লাভিয়ার জেসুইটদের চিঠি পড়ে শোনানো হতো। ওই সব চিঠিতে কোলকাতার কথাও বিশেষভাবে থাকতো। সে সব শুনে শুনেই কলকাতার প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল তার মনে। সেই সময়েই মিশনারি হওয়ার স্বপ্ন মনে অঙ্কুরিত হয়েছিল তার।

তখন আয়ারল্যান্ডের লরেটো সংঘ ইন্ডিয়াতে কাজ করছে। লরেটো সংঘের প্রধান কার্যালয় ডাবলিনে যোগাযোগ করলেন মাদার তেরেসা। তারপর মায়ের অনুমতি নিয়ে যোগ দিলেন লরেটো সংঘে। তখন মাদার তেরেসার বয়স মাত্র আঠারো বছর। সেই বছরেই, ১৯২৮ খ্রিঃ অ্যাগনেস জাহাজে ভেসে চলে এলেন কলকাতায়। যোগ দিলেন আইরিশ সন্ন্যাসিনীদের প্রতিষ্ঠান সিস্টারস অব লরেটোতে। এরপর মা-দিদিদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হয়নি তার। দার্জিলিং থেকে শিক্ষানবিশী হিসেবে দুবছরের পাঠক্রম শেষ করে সন্ন্যাসিনী ব্রত নিয়ে সিস্টার অ্যাগনেস হয়ে ফিরে এলেন কলকাতায়। এন্টালি সেন্ট মেরিজ স্কুলের বাংলা বিভাগে শিক্ষিকা নিযুক্ত হলেন তিনি। পরে ১৯৪২ খ্রিঃ ওই স্কুলের অধ্যক্ষা নিযুক্ত হন তিনি।

সিস্টার অ্যাগনেস থেকে মাদার তেরেসা হওয়ার গল্প
মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে দুমুঠো ভাতের আশায় দলে দলে গ্রামের মানুষ ভিড় করছে কলকাতায়। অনাহারে কুখাদ্য খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা যাচ্ছে। ১৯৪৬ খ্রি: ১০ই সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার সময় এক অলৌকিক উপলব্ধি হল তার। মাদার তেরেসা যেন ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ শুনতে পেলেন। “গরিবের সেবা করতে হলে গরিব হয়ে তাদের মধ্যে থেকেই তা করতে হবে।”

ঈশ্বরের এই আদেশ লাভের দিনটিকে দ্য ডে অব ডিসিশন — অনুপ্রেরণার দিন হিসেবে আমৃত্যু স্মরণ করতেন তিনি। উক্ত দিনটিকে তাদের সংঘের গোড়াপত্তন দিবস মনে করে দিনটিকে অনুপ্রেরণা দিবস হিসেবে পালন করে মাদার প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অব চ্যারিটি। মাদার সুপিরিয়রের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অ্যাগনেস লরেটো সন্ন্যাসিনীদের আলখাল্লা ছেড়ে তুলে নেন মোটা নীলপাড় শাড়ি। সেদিন তার সম্বল বলতে ছিল পাঁচ টাকা, একটি বাইবেল ও একটি জপের মালা। আর সঙ্গে ছিল অকল্পনীয় মনোবল ও ঈশ্বরে নির্ভরতা। সিস্টার অ্যাগনেস থেকে মাদার তেরেসায় রূপান্তরিত হবার সেই ছিল সূত্রপাত।

মানব সেবার বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন
১৯৫০ খ্রি: একান্ত নিঃস্ব অবস্থায় মাদার তেরেসা মিশনারী অব চ্যারিটি’র মাধ্যমে প্রথম সেবাব্রতের কাজ শুরু করলেন। মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন নিপীড়িত দরিদ্র অসহায়দের সেবায়। তিলে তিলে গড়ে তুলতে লাগলেন তার সেবা প্রতিষ্ঠান। দুঃখী দুঃস্থ আর্ত জর্জরিত মানুষকে তিনি একান্ত মায়ের স্নেহ মমতায় বুকে তুলে নিতে লাগলেন। তিনি যে মিশনারিজ অব চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন, তা আজ সারা বিশ্বে সম্প্রসারিত হয়েছে। মানবতার সেবা ও শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য তিনি বহুদেশে বহু শিশু ভবন, মহিলা কর্মকেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা কেন্দ্র, খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ কেন্দ্র এবং কুষ্ঠাশ্রম ইত্যাদি স্থাপন করেছেন।

মাদার তেরেসা কুষ্ঠ রোগীদের জন্য গড়ে তোলেন একটি চিকিৎসা ও সেবাকেন্দ্র। এই মহীয়সী নারী বৃদ্ধ বয়সেও সেবাব্রতের কাজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে অক্লান্তভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন ও আবার সুস্থ হয়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মুমূর্য দুস্থদের বুকে জড়িয়ে ধরেন। মাতৃত্বের এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল।

বিশ্ব দিয়েছে তাকে ভালোবাসার স্বীকৃতি
এই মহীয়সী নারীকে ইন্ডিয়া সরকার ১৯৬২ সালে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। এছাড়া ২৩ তম পোপ জন শান্তি পুরস্কার, গুডসামারিটান পুরস্কার, ম্যাগসেসে পুরস্কার ও এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অ্যাওয়ার্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ইংলন্ডের প্রিন্স ফিলিপ কর্তৃক টেম্পলটন অ্যাওয়ার্ড ফর প্রগ্রেস ইন রিলিজিয়ন পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৭৯ খ্রিঃ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান মাদার তেরেসা। ১৯৮০ খ্রিঃ ইন্ডিয়া সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করেন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস প্রয়াত মাদার তেরেসাকে ‘সন্ত’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

মহীয়সীর জীবনাবসান
‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন’ কবি কাজী নজরুলের এই লাইনটি যথার্থ প্রমাণ করেছেন মাদার তেরেসা। মানবকল্যাণের মূর্ত প্রতীক মাদার তেরেসা সবাইকে কাঁদিয়ে ১৯৯৭ খ্রিঃ ৬ সেপ্টেম্বর জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে যাত্রা করেন অমৃতলোকে। মানুষকে ভালোবাসার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি বেঁচে থাকবেন শতাব্দী থেকে শতাব্দী।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading