দেশের পর্যটন শিল্পে উঁকি দিচ্ছে অপার সম্ভাবনা

দেশের পর্যটন শিল্পে উঁকি দিচ্ছে অপার সম্ভাবনা

হাসনাইন তালাত শুভ । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৯:৩৫

সারা বিশ্বে পর্যটন শিল্প একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সুপরিচিত। পর্যটন শিল্প বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পর্যটন শিল্পে বিশ্বের বুকে এক অপার সম্ভাবনার নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পর্যটন বিকাশে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

বিশ্বের যে কোনো দেশের জন্য সম্ভাবনাময় খাত পর্যটন শিল্প। বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ পর্যটন খাতে ভালো প্রবৃদ্ধি করছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এ ছাড়া আগামী এক দশকে পর্যটন খাতে যে ১২টি দেশ দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি করবে, সেখানেও আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাব মতে, দেশের ভেতরে এখন বছরে ৮০ লাখ লোক ভ্রমণে বের হচ্ছেন। গত ৪-৫ বছরে এই সংখ্যা বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ হারে বেড়েছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক পরিবার এখন সঞ্চয়ের একটা অংশ আলাদা করে রাখে ভ্রমণের জন্য। ভ্রমণপিপাসুদের কল্যাণে দেশে বিকশিত হচ্ছে পর্যটন অবকাঠামো। হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য গড়ে উঠছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে এখন এক বিরাট অর্থনীতি।

বাংলাদেশ থেকেও অসংখ্য পর্যটক বিশ্বের নানা দেশে বেড়াতে যাচ্ছেন। ট্যুর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, শুধু মালয়েশিয়াতেই বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ পর্যটক যাচ্ছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ডে ৮৫ হাজার, ভারতে ৫ থেকে ৬ লাখ, সিঙ্গাপুরে ৩০-৪০ হাজার পর্যটক যাচ্ছে। এছাড়া নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কায় ভিসা লাগে না বলে সেখানেও যাচ্ছে বিপুল পর্যটক।

বাংলাদেশের পর্যটনের উপযোগী প্রধান প্রধান স্পট কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, পাহাড়পুর বিহার, ময়নামতি, মহাস্থান গড়, খলিফাতাবাদ (বাগেরহাট শহর), গৌড় লক্ষ্মণাবতী, সুন্দরবন, মাধবকুণ্ড, সীতাকুণ্ড পাহাড়, তিনটি পার্বত্য জেলা এবং বিভিন্ন জাদুঘর। জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বরেন্দ্র জাদুঘর, দিনাজপুর জাদুঘর, চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর। এ ক্ষেত্রে অবশ্য যশোরের দত্তবাড়ি, নওগাঁয়ের পতিসর রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি, শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি এবং শাহজাদপুর কাছারি বাড়ির ভূমিকাও একেবারে কম নয়। তা ছাড়া রয়েছে চা-বাগান, হাওর, বিল ও চর।

নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যরে অপার সম্ভার থাকলেও আমাদের পর্যটন শিল্প পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে। পিছিয়ে আছে কেন? এই প্রশ্নটি বারবার আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য এই খাতটির গতি বাড়ছে না। এই বিষয়ে একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তার মন্তব্য ছিল এই যে, বাংলাদেশ এ যাবৎ তার পর্যটন সম্পদগুলো সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জোরালো আবেদন তুলে ধরতে পারেনি।

সম্প্রতি আরো একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেটি হলো পর্যটন মৌসুম এলেই বড় বড় পর্যটন স্পটের আবাসিক হোটেল মালিকরা নানান অজুহাতে ভাড়ার টাকার অংক বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও খাবার বিক্রেতারাও একই অপকৌশল অবলম্বন করে। অনেক অনেক স্পটে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাইডেরও অভাব রয়েছে। সুতরাং অচিরেই এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে। দেশীয় পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটক আকর্ষণে প্রচার-প্রচারণার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। পাশাপাশি এ শিল্পের উন্নয়নের সাথে সাথে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সঠিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে পর্যটনে শিল্প অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে।

অনেক দেশ আজ পরিচিত কেবল তাদের পর্যটন শিল্পের জন্য। এমনকি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পর্যটন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের পরিধি বাড়াতে হলে আরো বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আরো ভালো পর্যটনবান্ধব পরিবেশও গড়ে তোলা দরকার। এ জন্য সরকার ও পর্যটন শিল্পের সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতার সঙ্গে সুপরিকল্পিত মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা জরুরি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading