আধুনিক প্রযুক্তির রূপকার স্টিভ জবস

আধুনিক প্রযুক্তির রূপকার স্টিভ জবস

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:০০

প্রযুক্তি জগতে সবচেয়ে বিখ্যাত নাম স্টিভ জবস। কম্পিউটার ও প্রযুক্তিকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের মাঝে স্টিভ জবস প্রধান এক চরিত্র। অ্যাপল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমরা সবাই স্টিভ জবসকে চিনি। সময়ের অন্যতম সেরা এই প্রযুক্তিবিদ সম্পর্কে জানাচ্ছেন গাজী কাইয়ুম

কেন আলোচিত স্টিভ জবস?
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তার অবদান সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমরা সকলেই কম বেশি তার অবদানের কথা জানি। তিনি তার কাজ দিয়ে এক নতুন বিশ্ব সৃষ্টি করে গেছেন। তার জীবন ছিল পৃথিবীকে বদলে দেয়ার এক বৈপ্লবিক যাত্রা। স্টিভ জবস যুক্তরাষ্ট্রের একজন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবক ছিলেন। স্টিভ জবসকে পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়। তিনি স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েন -এর সাথে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে “অ্যাপল কম্পিউটার” প্রতিষ্ঠা করেন। স্টিভ জবস অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। স্টিভ জবস “পিক্সার এ্যানিমেশন স্টুডিওস”-এরও প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

পরিবারহীন জন্ম ও শিক্ষা
স্টিভ জবস ১৯৫৫ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোয়ান শিয়েবল এবং সিরিয়ার বংশোদ্ভূত জন জানডালির কাছে। এ সময় তারা দুজনই অবিবাহিত ছিল এবং স্টিভেনকে দত্তক দেওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। স্টিভেনকে পল এবং ক্লারা জবস দত্তক নিয়েছিলেন, যাকে তিনি সর্বদা তার আসল বাবা-মা হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। স্টিভেনের বাবা পল তাকে তাদের গ্যারেজে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পরীক্ষা করতে উত্সাহিত করেছিলেন। ইলেক্ট্রনিক্স এবং ডিজাইনের প্রতি আজীবন আগ্রহী হয়েছিল।

জবস ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করে এবং পরে ওরেগনের পোর্টল্যান্ডের রিড কলেজে ভর্তি হয়েছিল। রিড কলেজে তিনি একটি ক্যালিগ্রাফি কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন যা তাকে মুগ্ধ করেছিল। পরে স্টিভ জবস বলেছিলেন যে এই কোর্সটি অ্যাপলের একাধিক টাইপফেস এবং আনুপাতিকভাবে ফন্টগুলির সমন্বয়ে সহায়ক ছিল।

স্টিভ জবসের ইন্ডিয়া ভ্রমন
স্টিভ জবস ১৯৭৪ সালে আধ্যাত্মিক আলোকিতকরণের সন্ধানে ড্যানিয়েল কোটকের সাথে ইন্ডিয়া ভ্রমণ করেছিলেন। তারা কোচির নিম করোলি বাবার আশ্রমে ভ্রমণ করেছিলেন। ইন্ডিয়াতে তিনি বেশ কয়েকমাস সময় ধরে বৌদ্ধ এবং পূর্বের আধ্যাত্মিক দর্শন সম্পর্কে সচেতন হন। এ সময় তিনি সাইকিডেলিক ওষুধের পরীক্ষাও করেছিলেন; পরে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে এই পাল্টা-সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাগুলি তাকে জীবন ও ব্যবসায় সম্পর্কে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।

স্টিভ জবস এবং অ্যাপেল
১৯৭৬ সালে ওয়াজনিয়াক প্রথম অ্যাপল আই কম্পিউটার আবিষ্কার করেছিলেন। জবস, ওয়াজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েইন তখন অ্যাপল কম্পিউটার সেটআপ করে। প্রথমদিকে, অ্যাপল কম্পিউটারগুলি জবসের পিতা-মাতার গ্যারেজ থেকে বিক্রি হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে, অ্যাপল কম্পিউটারগুলি দ্রুত প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে হোম কম্পিউটারগুলির বাজার ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। ১৯৮৪ সালে, জবস প্রথম ম্যাকিনটোস ডিজাইন করেছিল। গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস (জেরক্স পার্কের মাউস ড্রাইভার ইন্টারফেসের উপর ভিত্তি করে) এটি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সফল হোম কম্পিউটার ছিল। যা হোম কম্পিউটারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।

অ্যাপলে জবসের প্রচুর উদ্ভাবনী সাফল্য সত্ত্বেও, অ্যাপল-এ জবস এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে বিবাদ বাড়িয়ে তোলে। ১৯৮৫ সালে, তার পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে, জবস পদত্যাগ করে অ্যাপল ছেড়ে চলে যায়। পরে তিনি এই ঘটনার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বলেছিলেন যে অ্যাপল থেকে বরখাস্ত হওয়া তার কাছে অন্যতম সেরা ঘটনা ছিল। এটি তাকে নতুনত্ব এবং স্বাধীনতার অনুভূতি ফিরে পেতে সহায়তা করেছিল।

নেক্সট কম্পিউটার, পিক্সার ও ডিজনি
অ্যাপল ছাড়ার পরে স্টিভ জবস নেক্সট কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি কখনও বিশেষভাবে সফল ছিল না, ব্যাপক বিক্রয় লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে, ১৯৯০ এর দশকে, অ্যাপল স্টোর এবং আইটিউনস স্টোরটিতে ব্যবহৃত ওয়েবঅবজেক্টগুলির একটি ফ্রেমওয়ার্ক হিসাবে নেক্সট সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল।

১৯৮৬ সালে, জবস লুকাসফিল্মের গ্রাফিক্স বিভাগ হতে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে গ্রাফিক্স গ্রুপ (পরবর্তীতে পিক্সার নামকরণ করা হয়) ক্রয় করেন। এর মধ্যে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কোম্পানিটিকে মূলধন হিসেবে দেওয়া হয়। ডিজনির সাথে অংশীদারত্বের অধীনে প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র হল টয় স্টোরি (১৯৯৫), যেখানে জবসকে নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দেখানো হয়। মুক্তির পর এটি স্টুডিওর জন্য খ্যাতি এবং সমালোচনা উভয়ই বয়ে আনে। পরবর্তী ১৫ বছরে, পিক্সারের সৃষ্টিশীল প্রধান জন ল্যাসেটারের অধীনে, কোম্পানিটি বেশ কিছু বক্স-অফিস হিট চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে।

অ্যাপলে প্রত্যাগমন
১৯৯৬ সালে, অ্যাপল নেক্সটকে ৪২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ক্রয়ের ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে সহ-প্রতিষ্ঠাতা জবসের অ্যাপল কোম্পানিটিতে প্রত্যাগমন ঘটে। ১৯৯৭ সালে অ্যাপলের তত্‍কালীন প্রধান নির্বাহী গিল আমেলিওকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি অন্তবর্তীকালীন প্রধান নির্বাহীর পদ পেয়ে যান। পরে অ্যাপলকে পুনরায় লাভজনক কোম্পানিতে পরিণত করেন তিনি। এরপর থেকে, আকর্ষণীয় ডিজাইন এবং শক্তিশালী বিপণন ব্যবস্থা অ্যাপলের জন্য খুব ভালোভাবেই কাজ করতে থাকে। ২০০০ সালে তিনি অ্যাপলের স্থায়ী প্রধান নির্বাহীতে পরিণত হন।

বহনযোগ্য মিউজিক প্লেয়ার আইপড, আইটিউনস ডিজিটাল মিউজিক সফটওয়ার এবং আইটিউনস স্টোর চালু করার মাধ্যমে কোম্পানিটি ভোক্তা ইলেক্ট্রনিক্স এবং সঙ্গীত বিপণন বাজারে হানা দেয়। ২০০৭ সালে আইফোন অবমুক্ত করার মাধ্যমে অ্যাপল সেলুলার ফোন ব্যবসা শুরু করে। জবস তার পণ্য বিক্রয়ে দক্ষতার কারণে প্রশংসা এবং সমালোচনা উভয়ই পেয়েছেন।

পুনরায় অ্যাপল ত্যাগ
২০১১ সালের আগস্টে, জবস অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে তিনি কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন। ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেয়ার বাজারে অ্যাপলের পাঁচ শতাংশ দরপতন ঘটে। এই ক্ষুত্র দরপতন অ্যাপলে জবসের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত বহন করে।

ব্যাক্তিগত জীবনে ছিল স্বাস্থ্য ঝুঁকি
১৯৯১ সালে, স্টিভ জবস লরেন পাওয়েলকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের রয়েছে তিনটি সন্তান। ২০০৩ সালে স্টিভ জবস প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে, জবস স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার সাথে লড়াই করেছিল। ২০০৯ সালে তিনি লিভারের প্রতিস্থাপন করেছিলেন। তবে দু’বছর পরে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা ফিরে এসেছিল।

স্টিভ জবসের মৃত্যু
অবনতিগ্রস্থ স্বাস্থ্যের প্রতি মনোনিবেশ করতে অবসর নিয়েছিলেন আপেল থেকে। তিনি তার অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারজনিত জটিলতায় ভুগছিল। ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টোতে মৃত্যু বরণ করে বরেণ্য এই প্রযুক্তি নির্মাতা।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading