শিশু-মাতৃ মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ অর্জন
তৈয়বুর রহমান । রবিবার, ৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:১০
বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু ছিল উন্নতির অন্তরায়। কিন্তু সরকারের কিছু আন্তরিক চেষ্টা এবং এ ক্ষেত্রে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঐকান্তিক শ্রমে সমাধান হচ্ছে এই সমস্যার। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
বিগত ৫০ বছরে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে বাংলাদেশের অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। দেশে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাধীনতার সময় শিশুমৃত্যুর হার ছিল ১৪১, এখন তা ২১। অর্থাৎ, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশে বিগত বিশ বছরে শিশু মৃত্যুর হার ৬৩ শতাংশ কমিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশই ২০০০ সাল থেকে শিশু মৃত্যু হ্রাসে যথেষ্ট উন্নতি করেছে, যার প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ। শূন্য থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যকে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) স্বীকৃতি দিয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, স্বাধীনতার সময়ে মূল জোর ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ওপর। ওই সময় হাম, নিউমোনিয়া, টিটেনাস, ডিফথেরিয়ায় বহু শিশুর মৃত্যু হতো। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির ফলে এসব রোগে মৃত্যু কমে আসতে থাকে। ডায়রিয়ায় অনেক শিশু মারা যেত। স্যালাইনের ব্যাপক ব্যবহার ডায়রিয়ায় মৃত্যু কমায়। অপুষ্টিও শিশুমৃত্যুর কারণ ছিল। পুষ্টি কর্মসূচি পরিস্থিতির উন্নতি করে।
প্রথমেই আসি শিশুমৃত্যু রোধের কথায়। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৭.১। এক বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫.১ এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩২। নবজাতক মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে জন্মের সময় শ্বাস গ্রহণে সমস্যা ২৩ শতাংশ, কম ওজনের শিশু ২৮ শতাংশ, সংক্রমণ ৩৬ শতাংশ। কম জন্ম-ওজনের শিশুকে তার স্বাভাবিক জন্ম-ওজন লাভ করাতে বুকের দুধ পান এবং ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সের শিশুর পরিপূরক খাবারের ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
নবজাতকের শ্বাস গ্রহণে সমস্যা কমাতে ‘হেল্পিং বেবিজ ব্রিদ’ নামের একটি কর্মসূচি উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রতিটি হাসপাতালের শিশু বিভাগে চালু আছে। পাশাপাশি নবজাতক ইউনিটে ইনকিউবেটর ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি মজুদ আছে। সংক্রমণ কমাতে মা ও শিশুকে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিটেনাসের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কম জন্ম-ওজনের শিশু যাতে মায়ের সংস্পর্শে তাপমাত্রা ও বুকের দুধ পায়, সে জন্য প্রতিটি উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ নামে একটি সেবা চালু হয়েছে। এই কর্মসূচিতে সহায়তা দিচ্ছে ইউনিসেফ।
এবার আসা যাক মাতৃমৃত্যুর কথায়। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১.৭৩। যা ১৯৯০ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে প্রায় ৬ ছিল। এই মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসার পেছনে অনেকগুলো ধাপ আছে। প্রথমেই আসি গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম—গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী সেবা কমপক্ষে চারবার নিতে হবে। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রে এই সেবা বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রসূতি সেবার লক্ষ্যে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা ও অবেদনবিদ্যায় চিকিত্সকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তায় সরকার পরিচালনা করে থাকে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সব সময় চালু থাকছে। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের কী কী করণীয় এবং তাদের পুষ্টি পরামর্শ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া সরকারি কেন্দ্রগুলোর একটি বড় কাজ।
লেখক: সরকারি চাকরিজীবী
ইউডি/অনিক

