বিশ্ব ও ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ

বিশ্ব ও ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ

মো. সাইফুল ইসলাম । রবিবার, ৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১০:৫০

৫০ বছর আগে বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন পৃথিবীর মনোযোগ আকর্ষণ না করলেও বর্তমান সময়ে উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং ভূরাজনীতির আলোচনায় বাংলাদেশ কোনো না কোনোভাবে যে উল্লেখ্য, সেটা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পরের কয়েক দশক বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত ছিল মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং দুর্নীতির মতো নেতিবাচক সংবাদের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সকল নেতিবাচকতা দমিয়ে রেখে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ও ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে দ্বাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম শক্তি চীন ও আঞ্চলিক শক্তি ইন্ডিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নৈকট্য এবং দক্ষিণ এশিয়াসহ এ অঞ্চলে এ দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশ বিষয়ে আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এ বিবেচনায় আমেরিকাসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির কাছে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলাদেশ।

নব্বইয়ের দশক পার হয়ে ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে এসে আমরা লক্ষ করলাম যে এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছে। যার মূলে রয়েছে চীন এবং ইন্ডিয়ার অর্থনীতিতে একটা বড় ভূমিকা। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটা নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতি বা বিশ্ব পরিস্থিতি এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ একটি ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এসব জায়গাতে বাংলাদেশ একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। আমরা জানি যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে একটা সোচ্চার অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে কতগুলো ইস্যুতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নের ভূমিকা পালন করে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি। বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলো যারা এ জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার তাদের মুখপাত্র হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে সবসময়ই তৎপরতা প্রদর্শন করে আসছে।

গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যেকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের একদিকে যেমন প্রাচ্যমুখিতা আছে তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী।

একদিকে নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন-টোকিও, অন্যদিকে বেইজিং-মস্কো-আঙ্কারা, মাঝে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ব্রিটেন, ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বের সব বলয়ের সঙ্গে ‘ব্যালান্স’ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে বাংলাদেশ। ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘ভূ-রাজনীতিতে বিভিন্ন দিক থেকে বাংলাদেশ নিজেদের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পেরেছে।

বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব, ল্যান্ডলক দেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বিশ্বের পশ্চিম প্রান্তের সংযোগ ঘটানো, ১৬ কোটি মানুষের বাজার, অদম্য অর্থনৈতিক উত্থান, তৈরি পোশাক খাতের বহুমুখী উৎপাদন ও অগ্রগতি, জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়া- এসব কারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।’

একসময় বাংলাদেশ বিবেচিত হতো ইন্ডিয়াবেষ্টিত এবং ইন্ডিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে অবস্থিত এক ক্ষুদ্র আয়তনের দরিদ্র দেশ হিসেবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের এ পরিচয় যতটা প্রাধান্য পেয়েছিল, মধ্য সত্তরে পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন এবং ১৯৯০-এর দশকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অদলবদল এ পরিচয়ে পরিবর্তন আনে। যদিও বাংলাদেশ স্বতন্ত্রভাবে নিজের গুরুত্ব তৈরি করতে পেরেছিল, এমন দাবি করা যাবে না।

গত এক দশকে সেই অবস্থারও বদল ঘটেছে একাদিক্রমে চীনের উত্থান, বিশ্ব পরিসরে আমেরিকার প্রভাব হ্রাস, দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ইন্ডিয়ার সুস্পষ্ট প্রয়াস এবং তার প্রতি আমেরিকার সমর্থন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং তার আলোকে বাংলাদেশের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির কারণে।

ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বর্তমানে ঘাটতি না থাকলেও তা স্বাধীনতার পর পতন ও উত্থানের মধ্য দিয়ে গেছে। স্নায়ুযুদ্ধে নেওয়া নীতি অনুসারে আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতার কারণে এবং স্বাধীনতার পরে সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতার জেরে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনীতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন-টোকিও-বেইজিং-মস্কো ও আঙ্কারাসহ বিশ্বের সব পাওয়ার প্লেয়ারই দুটি কারণে বাংলাদেশকে তাদের কাছে টানার অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি হচ্ছে যার যার বৈশ্বিক জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ওয়াশিংটন-টোকিও ঢাকাকে চায়। অন্যদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড বাস্তবায়ন প্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে চায় চীন।

বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় এবং ব্যালান্স কৌশল নিয়ে কোনো পক্ষকেই ‘না’ করেনি আবার কাউকেই ‘হ্যাঁ’ও বলেনি। যেহেতু চীনের প্রকল্পে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরে কোনো সামরিক উপাদান নেই, তাই বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে ঢাকা জানিয়েছে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অর্থনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ কাজ করতে চায়, কোনো ধরনের সামরিক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা নেই।

সব মিলিয়েই আমরা একটা সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ রূপান্তরের ভেতরে আমরা আমাদের পররাষ্ট্র নীতিকে আরও কার্যকর করে এগিয়ে নিতে হবে এবং এটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। আগামীর বাংলাদেশ সম্ভাবনার পথে যেভাবে এগিয়ে চলেছে তার ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে আমরা সেই প্রত্যাশাই করি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading