ফেনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা তিন নারী

ফেনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা তিন নারী

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:২০

ফেনীতে গ্যাজেটভূক্ত নারী বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা তিনজন। এদের মধ্যে একজন বীরাঙ্গনা। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ফেনীর সহযোগিতায় কথা হয় তাদের সাথে। তারা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রহিমা বেগম, শাহাদাত আরা বেগম, কাওসার বেগম। সম্প্রতি মহিলা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে থাকছে এই সাহসী তিন নারীর গল্প।

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শাহাদাত আরা বেগম বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যতটুকু সম্মান পাওয়ার তা পাচ্ছি।

রহিমা বেগম জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার একটি ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছেন। তবে ২০১৭ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। এর পূর্বে অনেক দেন-দরবার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই বহুবছর সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন।

৫০ বছরেও শুকায়নি রহিমা বেগমের ভেজা চোখ:

একাত্তরের অক্টোবর-নভেম্বর নারকীয় নির্যাতন-যন্ত্রণায় কেটেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা রহিমা বেগমের। ফেনী পাইলট হাইস্কুলের একটি কক্ষে পাক হানাদারদের হিংস্র নির্যাতনে বারবার জ্ঞান হারিয়েছেন। ফেনী পাইলট ও ফেনী কলেজ কম্পাউন্ডে তখন পাক হানাবাদ বাহিনীর বড় ক্যাম্প ছিল। এখানে টর্চার সেল ছিল। প্রচুর মানুষকে এখানে মেরে ফেলে দেয়া হয়।

নিজের ওপর বর্বর নির্যাতনের বর্ণনাকালে গাল বেয়ে বয়ে চলেছে অশ্রুজল। পঞ্চাশ বছর পরেও মনের ক্ষত এতটুকু শুকায়নি। ৬ ডিসেম্বর ফেনী মহকুমা হানাদার মুক্ত হলেও রহিমা বেগমের মুক্তি মেলেনি। ছাগলনাইয়া হরিপুরে পৈত্রিক নিবাস। দুই ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধকালীন গ্রামেই ছিলেন বাবা-মায়ের সাথে। বিভিন্ন সময় রাজাকাররা এসে হাঁস-মুরগি নিয়ে যেত। গোলা হতে ধান, গাছ হতে ফল পেড়ে নিত। প্রায় সময় ভাইদের খোঁজ নিতে এসে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিত। অবশেষে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের এক রাতে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক হানাদার তুলে নিয়ে যায় রহিমা বেগমকে।

হরিপুরে বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধারা ছদ্মবেশে আসতো। কখনো মজুর, কখনো জেলে সেজে রাজাকার ও পাক বাহিনীর ওপর নজর রাখতো। সবসময় রহিমা বেগমের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা হত। মুক্তিযোদ্ধাদের বোন হওয়ায় সখ্যতা গড়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধার গ্রেনেড, গুলি আগলে রাখতেন রহিমা বিবি। কাছাকাছি দুরত্বে নিজেই একাধিকবার গ্রেনেড ও কার্তুজ বহন করে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্য গ্রুপের কাছে পৌঁছে দিতেন। এসব তথ্য রাজাকারদের কাছে একসময় পৌঁছে যায়।

দেশের জন্য সভ্রম হারিয়েছেন রহিমা বেগম। অথচ সমাজ হতে বাঁচতে স্বাধীনতার পর কিছুদিন গোপনে থাকতে হয়েছিল। সমাজে কথা রটে যায়। ১৯৭৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী সবকিছু মেনে নিলেও সন্তানরা সহজে মানতে পারেন নি।

কয়েকটি আক্রমণের আগে ছক এঁকে দিয়েছেন শাহাদাত আরা বেগম:

রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গেরিলাদের আক্রমণের পূর্বে নির্দিষ্ট স্থান রেকি করতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত আরা বেগম। এরপর ওই বাড়ি বা স্থানের ছক তৈরি করে গেরিলাদের রণকৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন। শৈশবের বন্ধু সোনাগাজীর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন, নাছির উদ্দিন, শফিসহ অন্যান্য গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন।

শাহাদাত আরা বেগমের পৈত্রিক বাড়ি সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়া। পৈত্রিক বাড়িটি ওভারশিয়ার বাড়ি নামেই পরিচিত। দাদা হাজি মাজহারুল হকের নামেও বাড়িটি পরিচিত। এ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা ছিল। তিনি জানান, চাচা মাহবুবুল হকসহ একাধিক আত্মীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

ইডেন কলেজের ছাত্রী শাহাদাত আরা বেগম ১৯৬৯ সালে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকালে কলেজ প্রাঙ্গনে আহত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে সোনাগাজী চলে আাসেন। তিনি বলেন, মার্চে সোনাগাজীতে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তাদের সাথে যুক্ত হই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সোনাগাজীতে রাজাকার ফকির আহাম্মদ ছিল আতঙ্কের নাম। কমপক্ষে ১৫ হতে ২০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে সম্পদ লুট করতে গিয়ে।

আমার প্রধান কাজ ছিল রাজাকারদের অবস্থান গেরিলাদের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং স্থানটির ছক তৈরি করা। এ কারণে বাড়ির সামনে এসে একাধিকবার রাজাকাররা হুমকি প্রদর্শন করে এবং আক্রমণের চেষ্টাও করে। তখন নিরাপদ স্থানে সরে পড়তাম। ৬ ডিসেম্বর ফেনী হানাদারমুক্ত হলে রাজাকার ফকির আহাম্মদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।

শাহাদাত আরা বেগম জানান, গেরিলারা তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাকে পাচ্ছিলো না। তখন গেরিলাদের বললাম, আমাদের বাড়িতে খোঁজো। আমার কাছে খবর ছিল, ফকির আহাম্মদ আমাদের বাড়িতে একটি ঘরে লুকিয়ে আছে। এরপর তাকে খুঁজে পাওয়া গেল এবং ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলা হল।

শাহাদাত আরা বেগম দীর্ঘদিন গার্লস গাইড এসোসিয়েশনে চাকরী করেছেন। বর্তমানে অবসর জীবনে স্বামী সন্তানসহ ঢাকায় বসবাস করছেন।

কাওসার বেগম নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে সেবা করেছেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের:

চট্টগ্রাম শহরের ঝাউতলায় তৎকালীন টিএণ্ডটি কলোনীতে বাবা-মা, ভাই-বোনসহ থাকতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কাওসার বেগম। বড় ভাই ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীসহ তিন ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। নিজে কাজ করেছেন আগরতলায় মেডিকেল ক্যাম্পে। পাঁচ বোনের তিনবোনই আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন।

কাওসার বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমাদের পরিবারের ওপর আক্রমণ করে বিহারীরা। প্রতিবেশী একটি পরিবার সাতদিন ঠাঁই দিলেও পরে অপারগতা জানান। দাগনভূঞায় পৈত্রিক বাড়িতে পাঁচবোনকে নিয়ে বাবা চলে আসেন। কিন্তু এখানেও ঠাঁই মিললো না। বারবার রাজাকার আসে ধরে নিয়ে যেতে। এভাবে কয়েকরাত কেটেছে তারাও বিপদে পড়ছিল। পরে বাধ্য হয়ে আমরা চার বোন আর ছোট দুই ভাই বিলোনিয়া দিয়ে ভারত পাড়ি দেই। তখন আমার তিন ভাই আগরতলা।

সেখানে ১০দিন রাইফেল চালনা প্রশিক্ষণ নিই। কিন্তু এরমাঝে খবর আসে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হচ্ছে। তখন প্রশিক্ষক বলছিলেন, সবাই রাইফেল প্রশিক্ষণ না নিয়ে নার্সিং প্রশিক্ষণ নেন। আহতদের সেবা করুন। আমার ভাইদের পরামর্শে প্রথমে আমার বড়বোন নার্গিস আক্তারসহ চোত্তাখোলায় নার্সিং মেডিকেল কোরে প্রশিক্ষণ নিই। এরপর হাসপাতালে কাজে লেগে যাই।

প্রথম যেদিন হাসপাতালে গেলাম, দেখতে পাই হাত-পা ভর্তি বালতি আর বালতি। হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে স্তুপাকারে হাত-পা। ভবনের উপরে নিচে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাদ। আমাদের দেখে বলছিল, আমাদের বাঁচান। বলছিলো, আমাদের মা বোনরা এসেছে, এবার চিকিৎসা হবে।

যে মেয়েগুলো সেবা দিচ্ছিলো, তাদের হাত, কাপড় রক্তে ভেজা, কাঁপছিল তারা। তখন জানতে পারি, এগুলো আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাত-পা। ডাক্তার ও নার্স সংকটের কারণে অতিরিক্ত সংখ্যক আহতকে চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছিলো না। চিকিৎসায় ক্ষতস্থানে পঁচন ধরতে পারে। এতে মৃত্যু ঘটবে তাই জীবন বাঁচাতে পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হচ্ছে। কাওসার বেগম জানান, যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় নিরলস কাজ করেছেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading