রপ্তানি নিষিদ্ধে বাড়ছে দাম
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১০:৫২
যুদ্ধ হচ্ছে ইউক্রেইনে। তার জের পড়েছে বিশ্বের খাদ্য বাজারে; রকেট গতিতে বাড়ছে দাম। খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে ধনী-গরিব সব দেশ। ইউক্রেইনে আগ্রাসনের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আমেরিকা। তারা রাশিয়া থেকে তেল, গ্যাস ও কয়লা আমাদনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। রাশিয়ার জ্বালানির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ইউরোপও ধাপে ধাপে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছে। রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ, ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনে তাদের অবস্থান দ্বিতীয়।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজ গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বের মোট তেলের ১৪ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে৷ রাশিয়ার মোট তেল রপ্তানির ৬০ শতাংশ যায় ইউরোপে৷ ৩৫ শতাংশ যায় এশিয়ায় ৷ জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে শুধু রাশিয়া নয়, এই নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা খোদ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে লাগবে।
রাশিয়ার জ্বালানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে এমন খবরেই তেলের বাজারে আগুন লেগে গেছে। ব্যারেল প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ১৩০ মার্কিন ডলারে পৌঁছে গেছে। দাম উঠেছিল ১৩৯ ডলার পর্যন্ত।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ খাদ্যপণ্যেসহ সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়া। পৃথিবী জুড়েই যার প্রভাব শুরু হয়ে গেছে। নিজ দেশের চাহিদা অনুযায়ী যোগান ঠিক রাখতে এখন অনেক দেশ খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তাও করছে। যা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলবে। ইউক্রেইনে যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদন, ভোজ্য তেলের যোগান এবং সার রাপ্তানি হুমকিতে পড়ে। নিত্যপণ্যের দাম রকেট গতিতে বাড়তে শুরু করে। জ্বালানির বাজারে বিশৃঙ্খলা ওই সংকটকে আরো ঘণীভূত করেছে।
ভোজ্য তেল হিসেবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পাম অয়েল। অনেক পণ্য তৈরিতেও এটির ব্যবহার হয়। এ বছর পাম অয়েলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া নিজ দেশে রান্নার তেলের দাম ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখতে রপ্তানি হ্রাস করছে বলে জানান দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ লুফতি। টানা দুই বছর কোভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপে বিশ্বের সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। নানা কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে।
টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে মহামারীর ওই ভয়াল থাবা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি যখন বেরিয়ে এসে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করেছে ঠিক তখনই ইউক্রেইন যুদ্ধ মানবজাতিকে মহামারীর চেয়েও ভয়ঙ্কর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
রাশিয়া এবং ইউক্রেইন উভয়ই বিশ্ব বাজারে ভোজ্য তেলের গুরুত্বপূর্ণ যোগানদাতা। একই সঙ্গে ওই দুই দেশ বিশ্বের ৩০ শতাংশ গম রপ্তানি করে। গতকাল বুধবার ইউক্রেইন সরকার এ বছরের জন্য বার্লি, চিনি ও মাংসসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির উপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহনও বিঘ্নিত হচ্ছে। রাশিয়ার গ্যাসের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এটির দামও হু হু করে বাড়ছে। যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে সারের দাম। কারণ, সার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর সারের দাম বাড়া মানে শস্য উৎপাদন ব্যাহত হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য বিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বজুড়ে খাবারের মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড হয়েছে। এ মাসে যা আরো বাড়ছে।
ইন্দোনেশিয়ার তেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মালয়েশিয়ায় পাম অয়েলের দাম বেড়ে গেছে। এদিকে, সয়াবিন তেলের দাম গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ বছর সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
যোগানের ঘরে ধাক্কা:
রাশিয়া এবং ইউক্রেইন উভয়ই সূর্যমুখী তেলের বড় যোগানদাতা দেশ। বিশ্বে ৮০ শতাংশ সূর্যমুখী তেল রপ্তানি করে তারা। উভয় দেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং নানা বিধ নিষেধাজ্ঞার কারণে সূর্যমুখী তেলের যোগান মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ কারণেও পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের চাহিদা বাড়বে।
শিকাগো হুইট ফিচার্স এ এই বছর গমের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। একে তো যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেইন থেকে গম পাওয়া যাচ্ছে না। মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে চীনের গম উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গম রপ্তানিকারক দেশ চীন। কিন্তু এ বছর সেখানে গমের উৎপাদন ‘ইতিহাসে সব থেকে নিকৃষ্ট’ হয়েছে বলে জানান দেশটির কৃষিমন্ত্রী।
খরার কারণে আমেরিকাতেও গম উৎপাদন অন্যান্য বারের তুলনায় অনেক কম। বুধবার সার্বিয়া তাদের গম, ভুট্টা, আটা, ও রান্নার তেল রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। হাঙ্গেরি গত সপ্তাহেই তাদের সব ধরনের শস্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে।
বুলগেরিয়া তাদের শস্য মজুদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছে, সরকারির মজুদের জন্য পরিকল্পনা মাফিক শস্য কিনতে না পারলে তারও রপ্তানি নিষিদ্ধ করবে।

