ঢাকার ভাসমান ও বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন জরুরী

ঢাকার ভাসমান ও বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন জরুরী

তন্ময় কুমার রায় । বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:১৫

কোন শহরে কতটি বস্তি আছে। শহরগুলোতে ভাসমান লোকের সংখ্যা কত? ঢাকা শহরে বস্তিবাসী বা ভাসমান জনসংখ্যা কত, কেমন তাদের জীবন? যখনি কোনো জায়গায় আগুন লাগে তখনি নানান খবর পত্রিকায় যেমন দেখা যায়, এইজন্যে করা দায়ী? কি সমাধান? এইসব নিয়ে টকশোতেও আলাপ ভালোই জমে। কিন্তু কিছুদিন না যাইতেই সব ভুলে যায় বাঙালি! আবার নতুন কোনো ঘটনায় মন চলে যায়।

আগুন লাগলেই বস্তি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়। কয়দিন পর পরই দেখা যায় কোনো না কোনো বস্তিতে আগুন লেগেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবার কখনো মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই আগুন লাগার সূত্রপাত ঘটে। যদিও অনেক সময় আগুন লাগার প্রকৃত কারণ ও তদন্ত প্রতিবেদন জানা যায় না। তবে প্রভাবশালীদের ক্ষমতার ক্রীড়নক হলো বস্তিবাসীরা। ভোটের সময় মিছিলের আগে, হরতালে পিকেটিং, মাদকের ব্যবসাসহ নানান অপরাধের স্বর্গরাজ্য হলো বস্তি। আবার কাকরাইল, কারওয়ানবাজার এলাকাসহ অনেক এলাকায় রাতে রাস্তায়/পথচারীদের হাঁটার জায়গায় ঘুমিয়ে রাত কাটাতে দেখা যায় অনেক ভাসমান লোক। কত ভয়ংকর ও অনিরাপদ জীবন তাদের নিজের চোখে না দেখলে বুঝানো যাবে না।

বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বস্তিগুলোর একটি হল কড়াইল বস্তি। ঢাকার সকল বস্তির মোটামুটি একই রকম চেহারা। সরু ঢোকার পথ, অসংখ্য অলি-গলি, অন্ধকার খুপরি, নোংরা গোসলখানা ও টয়লেট, এখানে সেখানে জমে আছে আবর্জনা। কোনরকমে একটা খাট বসালেই ঘরের জায়গা শেষ। নেই পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। নেই বাচ্চাদের জন্যে খেলাধুলার কোনো মাঠ। নেই প্রচলিত কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা। যদিও কিছু বেসরকারি সংস্থা কিছু কিছু স্কুল খুলে কিছু সময়ের জন্যে ঝরে পড়া বাচ্চাদের পড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। সেটাও অপ্রতুল বটে। স্যানিটারি লেট্রিন, বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতার জন্যে অনেক পানিবাহিত রোগ, এছাড়াও সারা বছরই লেগে থাকে কোনো না কোনো অসুখ। ভালো পোশাকের অভাবে অনেক শিশুরা অর্ধ নগ্ন অবস্থায় খেলা করে বাসার সামনের খালি জায়গায়। যা শহরের পরিবেশ নষ্ট করে।

সরকারি কোন জমির উপরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জায়গা দখল করে ঘর তুলে সেগুলো ভাড়া দিয়ে থাকেন। এসব জায়গাতেও ঘর ভাড়া দিতে হয় ৩-৪ হাজার টাকা। কোনো কোনো এলাকায় ঘর ভাড়া কিছুটা বেশি। মাসে ৫০০ টাকা দিতে হয় পানির বিল আর গ্যাস বিল ৩০০ টাকা। বিদ্যুতের বিলও দিতে হয়। তবে মূলত সেগুলো সংগ্রহ করেন খুপরির মালিক। অনেকে নিজের খুপরি নিজেই তৈরি করে নেন। এসব বস্তিতে মূলত যারা বাস করেন তারা পেশায় বেশিরভাগই পোশাক কর্মী, গৃহকর্মী, দিনমজুর, রিকশা চালক অথবা কেউ হয়ত কোন খুচরা ব্যবসার সাথে জড়িত।

ঢাকায় বস্তি ও বস্তিবাসীর সংখ্যা ঠিক কত?বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৪ সালে বস্তি শুমারি করেছিলো পরিসংখ্যান ব্যুরো। এরপর সে নিয়ে আর কোন তথ্য পাওয়া যায় না।প্রতিবছর নদী ভাঙণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা শুধু কাজের খোঁজেই হাজার হাজার মানুষ ঢাকা আসছেন। ২০১৪ সালে বস্তি শুমারি অনুযায়ী ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি রয়েছে। সেখানে মোট ঘরের সংখ্যা দেখানো হয়েছে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজারের মতো।

ভাসমান লোকের সংখ্যা সঠিকভাবে নিরুপণ করা, বস্তিবাসীদের সঠিক হিসেব নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্ররিকল্পনা করে শহর থেকে ভাসমান লোকজন কমানো এবং বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন করা গুরুত্বপূর্ণ। এতো লোকের জন্যে পুনর্বাসন জটিল বটে ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে সঠিক কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে অসম্ভব নয় বস্তিবাসীদের ও ভাসমানদের পুনর্বাসন। একজায়গায় ভেঙে দিয়ে আরেক জায়গায় গড়ে উঠে বসতি। ভাঙা গড়ার এই খেলায় কত জীবন যে গেছে বৃথায়। তবুতো মানুষ বাসা বানায়। স্বপ্ন দেখে। নতুন দিনের নতুন ভোরের সূর্য কখন যে ফিনকি দিয়ে আলো দিবে। আর একটা নতুন দিন শুরু হবে। জীবন এমনি। সবার জন্য নিরাপদ জীবন ও সুখময় ভবিষৎ রচিত হবে সেই প্রত্যাশা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading