সমৃদ্ধ জাতি গঠনে প্রয়োজন সুশিক্ষা
খায়রুন নাহার । বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১০
মানুষের যে নৈতিকতা গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে, সেই শিক্ষা এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, পড়েছে নড়বড়ে হয়ে। দেশে শিক্ষাপদ্ধতি আর শিক্ষানীতি নিয়ে বিতর্ক বেশ জমজমাট। বাংলাদেশের শিক্ষার মান ও সার্বিক নড়বড়ে অবস্থা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ আমার মতে সুশিক্ষা অর্জিত না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনই আসতে পারে না।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়াও নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গ এক কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। এখন এই ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা শুরু হয়েছে। কিন্তু উপায় যে আর মেলে না। আমি গোটা শিক্ষাপদ্ধতির গলদ খুঁজে বের করে এর স্থায়ী প্রতিকারের জন্য সরকার ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম বেশ আগেই। এটা বাস্তবায়নের জন্য দেশে একটি বা একাধিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষকদের মধ্যে বুনিয়াদী, কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার এক নতুন চিন্তা সরকার ও দেশবাসীর কাছে উপস্থাপনও করেছিলাম।
এই লক্ষ্যে একত্রে কাজ করার জন্য সরকার ও জনগণকে অনুরোধ করছি আবারও। সেখানে যেন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এক অগ্রণী চিন্তায় আমার পৃথিবী উদ্ভাসিত হয় আমার জ্ঞানের আলোকে। এই শিক্ষা হবে আমাদের উপার্জনের হাতিয়ার।
শিক্ষা গ্রহণের পরেই কিন্তু প্রতিটি মানুষের সব ব্যস্ততা আবর্তিত হয় প্রত্যাশিত একটি চাকরিকে ঘিরে। এক্ষেত্রে দেশে এমন অবস্থা বিরাজ করছে যেখানে উচ্চ শিক্ষিত হতে যত বছর সময় লাগছে, চাকরি পেতে সেই ছাত্র/ছাত্রীকে এর চেয়েও বেশি সময় অপচয় করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি একাধিক আধুনিক ধারণা দিয়েছি।
বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ঊর্ধ্বমুখী এক দেশ। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সময়ের স্রোতে এ দেশের সব সেক্টরেই লেগেছে আজ ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। কিন্তু আমাদের ধ্যানে-জ্ঞানে এ ছোঁয়া আজও লাগেনি! চাহিদা বলছে কী পড়তে হবে এবং কেন পড়তে হবে। এ সময়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং প্রত্যেকটি শিক্ষককে জানতে হবে চাহিদাগুলো কী এবং তার জন্য কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সকল শ্রেণির শিক্ষকদের সুশিক্ষা গ্রহণ ও প্রদানের আওতায় আনতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী শিক্ষা অনুসন্ধান করা হবে এবং সেটি চর্চা করার জন্য একটি অনুকূল শিক্ষাব্যবস্থাও প্রণয়ন করা হবে।
শিশুদের ১-১৫ বছর বয়সের মধ্যের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে মানবতার ফর্মে আনতে হলে তাদেরকে মানসম্পন্ন পরিবেশের মধ্যে শিক্ষা দান করে গড়ে তুলতে হবে এবং একই সাথে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরে পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে সুশিক্ষার সার্বিক অবকাঠামো যেখানে থাকতে হবে ‘জানা থেকে শেখা।
কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অনিয়ম যেন কলুষিত করতে না পারে শিক্ষা প্রশাসনকে, শিক্ষাঙ্গনকে। একই সাথে গণতন্ত্রমনা ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে নিরাপদে ও গর্বের সাথে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবে সবাই এবং মতামতের ভিন্নতা সত্ত্বেও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তারা সামাজিক ঐক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।
আছে কি বাংলাদেশের শিশু বিদ্যালয়ে এমন কোন শিক্ষক বা শিক্ষা পদ্ধতি চালু, যেখানে চর্চা হচ্ছে এমন মানসম্মত শিক্ষা? বা সেইভাবে তৈরি হচ্ছে কি তেমন শিক্ষক যিনি পারবেন মোকাবিলা করতে ভবিষ্যতের এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধারার একমাত্র বাহক শিক্ষক সমাজই যদি মজবুত না হয়, শিক্ষার্থী নামক নতুন দিনের অভিযাত্রীরা কি নির্বিঘ্নে শিক্ষা নামক বৈতরণী পাড়ি দিতে পারবেন?
বর্তমান শিক্ষা গতানুগতিক, অসম্পূর্ণ, সনদপত্র সর্বস্ব, তত্ত্বীয় বিদ্যাপ্রধান, অপর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা, মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল এবং পুরনো পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারী, তাই আশানুরূপ ফল লাভ হচ্ছে না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বেকার তৈরির কারখানা হবে না। বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে তার সমাধান। তাই শিক্ষাঙ্গনে এক বিরাট পরিবর্তনের জন্য চাই সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রত্ন নির্ণয়ে যেমনটি পাঁকা জহুরী প্রয়োজন ঠিক তেমনি আগামীর প্রজন্মকে এগিয়ে দিতে দরকার এক প্রশিক্ষিত কারিগর।
শিক্ষার জন্য গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। তার আগে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা সুস্পষ্টভাবে দাঁড় করাতে হবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে, এর পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতে হবে, তৈরি করতে হবে উপযুক্ত ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু নীতিনির্ধারকরাই বা এগুলো কিভাবে করবেন?
এগুলোওতো সুশিক্ষার ব্যাপার। এ কারণে সর্বগরে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হতে হবে, সেখানেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। সুশিক্ষার জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু হোক শুরু থেকেই, মাঝখান থেকে নয়।
লেখক: শিক্ষিকা

