আইনি ব্যবস্থা নিতে হাই কোর্টের নির্দেশ: অবৈধ মজুদদারদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে

আইনি ব্যবস্থা নিতে হাই কোর্টের নির্দেশ: অবৈধ মজুদদারদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১০

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে পুঁজি করে দেশের বাজারে কোনো কারন ছাড়াই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পায়তারা করছে একদল ব্যবসায়ী। তারা ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের বিপুল মজুদ করছে। সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যারা অবৈধভাবে মজুদ করছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। বিস্তারিত লিখেছেন মো.আসাদুজ্জামান

সরকারের ঠিক করা দামে নিজেদের পণ্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকছেন এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা। তারা ওইসকল পণ্যের বিপুল মজুদ করছেন যেনো পরবর্তীতে চড়া দামে বিক্রি করতে পারেন এবং বাজারের পরিবেশ অস্থির করে তুলতে পারেন। ইতোমধ্যে সরকারও এই ব্যবসায়ীদের নজরবন্দীতে নিয়ে আসছেন এবং মাঠ পর্যায়েও কাজে নেমেছেন।

আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোট: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যারা অবৈধভাবে মজুদ করছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। সয়াবিন তেলসহ নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকের নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিট আবেদনের ওপর তিন দিন শুনানি নিয়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) এ আদেশ দেয়। পাশাপাশি বেআইনিভাবে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি ও পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সরকারের কাছে তা জানতে চেয়েছে আদালত। বাণিজ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, খাদ্যসচিব, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান, টিসিবি চেয়ারম্যান, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের আদেশ বাস্তবায়ন করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আদালতে রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ মহিদুল কবীর। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। সয়াবিন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মনিটরিং সেল গঠন এবং নীতিমালা তৈরি করতে গত ৬ মার্চ এই রিট আবেদন করেন সৈয়দ মহিদুল কবিরসহ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মহিদুল কবীর, মনির হোসেন ও মোহাম্মদ উল্লাহ। বাণিজ্যসচিব, খাদ্যসচিব, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতিসহ আটজনকে সেখানে বিবাদী করা হয়।

দেশজুড়েই মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার: সরকার খাদ্য পণ্যের বাজার দর ঠিক করে দিচ্ছে। আর একটা গ্রুপ জোটবদ্ধ হয়ে সেসব পণ্য মজুদ করছে। পরে দাম বাড়িয়ে তা বাজারে ছাড়ছে। জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। যারা দুষ্কৃতকারী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সারা বছর বাজার তদারকি করতে হবে। রোজা আসলে তদারকি হবে, এমনটা হলে হবে না। এটা প্রতিদিনের কাজ, প্রতিদিন করতে হবে। ইতোমধ্যেই সরকার এই বিষয়ে বাড়তি নজরদারি শুরু করেছে। দেশজুড়েই মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার। প্রতিদিনই সারা দেশ থেকে মজুদ করা পণ্য উদ্ধার করছে সংশ্লিষ্টগণ।

দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে ভিন্ন চিত্র: ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সভায় অর্থমন্ত্রী ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বিভান্ন বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোয় নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করেনি দোকানিরা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বাজারে ও তেলের মিলে অভিযান শুরু করেছে। পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল করতে ইতোমধ্যে তিন ধাপে ভোজ্য তেলের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

লাগাম চলে গেছে ‘জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর’ হাতে: আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় নিত্যপণ্যের বাজার ‘জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর’ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে মন্তব্য এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। আর সেটাই জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে দেখছে হাই কোর্ট। বাজারে কোনো ‘সিন্ডিকেট নেই’ বলে মন্ত্রীদের দাবি করে আসার মধ্যে গত সোমবার (১৪ মার্চ) এক রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. মনিরুজ্জামানের হাই কোর্ট বেঞ্চ থেকে এই মন্তব্য আসে। সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে করা এই রিট আবেদনে আদালত কোনো আদেশ না দিলেও বলেছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার আইন করলেও এখন পর্যন্ত বিধি না করায় আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন সম্ভবপর হচ্ছে না। আর এর সুযোগ নিচ্ছে জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠী।

বাজার দর নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে: সোমবার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, ইতিমধ্যে সয়াবিন তেলসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সরকার বাজার তদারকিতে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এ রিটে রুল জারি করা ঠিক হবে না। তখন বেঞ্চের এক বিচারক বলেন, প্রতিযোগিতাবিরোধী জোট কীভাবে নিরূপণ করছেন? ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন নেই। প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি, কর্তৃত্ব বন্ধ করতে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ভোজ্য তেলের আমদানি পর্যায়েও ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহার: পরিশোধন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং বিপণন পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের পর সয়াবিন তেল ও পাম তেলের আমদানি পর্যায়েও ১৫% ভ্যাট তুলে নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা গাজী তাওহীদুল ইসলাম মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে আনুষ্ঠনিক পরিপত্র জারি করবে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় গত কিছুদিন ধরেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বিক্রেতারা দাম বাড়াতে থাকায় সরকারকে উদ্যোগী হতে হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মনিটরিং সেলের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে চাল-ডাল, তেল, লবণ, হলুদ-মরিচ, সবজি, মসলাসহ জীবনধারনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই সময়ে সয়াবিন তেলের দাম ৩৮ শতাংশ, আর পাম তেল ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গরুর মাংসের দাম ১৫ শতাংশ, খাসির মাংস ২৩ শতাংশ এবং দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।এ পরিস্থিতিতে রোজার আগে বাজার পরিস্থিতি সামলাতে তেল, চিনির মত নিত্যপণ্য আমদানিতে ভ্যাট কমানোর নির্দেশ দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, ভোজ্য তেল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এটা কীভাবে, কতটুকু কমানো যায়, সে বিষয়ে এনবিআরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোজ্যতেল, চিনিসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমাতে বলা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও সোমবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ভোজ্যতেলে ভোক্তা পর্যায়ে ৫ শতাংশ কমানো হবে। উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ সেখানে কমানোর কথা বলা হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ রয়েছে, সেখান থেকে ১০ শতাংশ কমানো হবে। কী পরিমাণ কমানো হবে সেটা এনবিআরের এসআরও প্রকাশের পর জানা যাবে।এরপর সোমবার বিকালে সয়াবিন তেল ও পাম তেল পরিশোধনে ১৫ শতাংশ একং বিপণন পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

দ্রুতই দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে: নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে বিএনপি বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য দিচ্ছে অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বাজারেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে বাজারের এই সংকট থাকবে না এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবো। মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) এক বিবৃতিতে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।

জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর সরকার: ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়েই বর্তমান সরকারের সকল পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। প্রধানন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে আমদানি পর্যায়ে তেল, চিনিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা।’

পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে কাজ করছে সরকার: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কীভাবে পণ্যের সরবরাহ আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তিনি বলেন, টিসিবির গাড়ির পেছনে দীর্ঘ লাইন হচ্ছে, আমরা সবই দেখছি। চেষ্টা করছি মানুষকে কীভাবে কমফোর্ট জোনে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু বাস্তবতাও মানতে হবে। যুদ্ধের কারণে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে পড়েছে। মঙ্গলবার ( ১৫ মার্চ) চট্টগ্রাম নগরীর মোটেল সৈকতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।

ভোক্তাকেও অধিকার রক্ষায় সচেতন হতে হবে: ভোক্তাকেও তার অধিকার রক্ষায় সচেতন হতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর আয়োজিত ‘বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস-২০২২’ এর আলোচনাসভায় এসব কথা বলেন তিনি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় ন্যায্যতা’।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভোক্তার অধিকার রক্ষায় সবাইকে কাজ করতে হবে। সরকার ভোক্তার অধিকার রক্ষায় আইন করেছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ হচ্ছে। ভোক্তা সচেতন হলে আইন প্রয়োগ সহজ হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেনদেশের মানুষ এখন ডিজিটাল সুবিধা ভোগ করছে। অনৈতিক সুবিধা যাতে কেউ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। সেই সুযোগে যাতে কেউ অনৈতিকভাবে লাভবান হতে না পারেন, সে বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকতে হবে।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading