অবাধে ইন্টারনেট ব্যবহার শিশুদের মেধা বিকাশের অন্তরায়

অবাধে ইন্টারনেট ব্যবহার শিশুদের মেধা বিকাশের অন্তরায়

মো. রায়হান আলী । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:২৯

যে ইন্টারনেট সেবা গোটা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, সে ইন্টারনেট সেবা এখন অনেক প্রেক্ষাপটে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ইন্টারনেট শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধরাও ব্যবহার করে থাকে। বিআইজিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিরা অন্যান্য বয়সের ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং এ বিষয়ে তাদের দক্ষতাও আছে।

প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইন ব্যবহার করছে। প্রতি আধা সেকেন্ডে একটি শিশু অনলাইন দুনিয়ায় প্রবেশ করছে এবং এতে দেশের ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছে। একাধিকবার হয়রানির শিকার হচ্ছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। হয়রানির কারণে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে বলে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ) এর গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম। গবেষণা বলছে, একজন মানুষ দিনে অন্তত ২ হাজার ৬৬৪ বার তার নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করে। আর এই স্ক্রিন স্পর্শ করার কারণ ফোনের নোটিফিকেশন চেক, কোনো এসএমএস আসল কিনা ইত্যাদির দিকে মনোনিবেশ করে। অল্পবয়সিরা লেখাপড়ার প্রতি মনোনিবেশ না করে দিনে দিনে ঝুঁকে যাচ্ছে ইন্টারনেটের অপব্যবহারে। বর্তমানে যারা দ্রুত ইন্টারনেটে আসক্ত হচ্ছে তাদের বয়স ১৪-২৪ বছর অর্থাৎ তরুণ সমাজ। এদের মধ্যে প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত এবং পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ ভিডিও গেম খেলে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ, যাদের মধ্যে ১০ কোটি ৩২ লাখ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। এই বিশাল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতিদিন শুধু পাবজি নামক ভিডিও গেম খেলে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। এসব ভিডিও গেম খেলার ফলে শিশু-কিশোর বা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়; এমনকি চোখের দৃষ্টি শক্তির হ্রাসসহ মানসিকভাবে অনেকে বিকারগ্রস্ত হচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অল্প বয়সিরা জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধ, কিশোর গ্যাং অপরাধসহ নানাবিধ অপরাধে।

ইন্টারনেট গেমে সাধারণত বন্দুক, পিস্তলসহ গোলাবারুদ ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যার ফলে যখন তারা গেমে পরাজিত হয় তখন তাদের মন এবং মেজাজ খিটখিটে হয় ও একে অপরের সঙ্গে রাগারাগি, ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। শিশু-কিশোররা আগামীর কর্ণধার। তাদের মানসিক বিকাশে এই ইন্টারনেটের অপব্যবহার দিন দিন যেন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। মাদকাসক্তের চেয়েও বেশি আসক্ত হচ্ছে ইন্টারনেটে হোয়াটস আপ, ফেসবুক, ভাইবার, ইমো, ম্যাসেঞ্জার, গুগল, ইউটিউবে।

গত দুই বছরে করোনার প্যান্ডামিক অবস্থায় করোনা সংক্রমণ রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বন্ধ রাখতে হয়েছে সরকারকে। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ অন্যদিকে অনলাইন ক্লাসের নামে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত সবার হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন-ল্যাপটপসহ পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটের এই সুবিধার অপব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছে অনলাইন ভিডিও গেমিংয়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

একটা সময় ছিল যখন শিশু-কিশোরদের দেখা যেত মাঠে খেলা করতে। বিকেল, সকাল ও দুপুর। যখন খেলতে যেত কিশোররা, তাদের কলকাকলীতে মাঠগুলোকে ফুরফুরে সতেজ মনে হতো। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, কানামছি, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা একটা স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল। এখন প্রযুক্তির রঙিন দুনিয়াতে কিশোররা ত্যাগ করেছে মাঠ। মাঠ আপন করে নিয়েছে সুউচ্চ অট্টালিকাকে।

বর্তমানে জনপ্রিয় কিছু গেম পাবজি, কল অব ডিউটি, ফ্রি ফায়ার, প্রো ইভুলেশন সকার (পেইস) ব্যবহার করে আসক্ত অনেক শিক্ষার্থী। অল্পবয়সিদের ইন্টারনেটের ভয়াল গ্রাস থেকে মুক্ত রাখার জন্য অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সন্তান মানুষের মতো মানুষ করতে হলে তাদের উপযুক্ত নার্স করতে হবে, তবেই সন্তান মানুষ হবে।

লেখক: আইনজীবী

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading