মানসিক হাসপাতালগুলোকে নজরজারিতে আনা হোক
জাহিদ হাসান । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:০০
ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মানসিক হাসপাতালের সাইনবোর্ড দেখা যায় যত্রতত্র। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই এসব মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে দেওয়া হচ্ছে মানসিক চিকিৎসা। এই চিকিৎসা নিয়ে চরম নৈরাজ্য চলছে বহুদিন ধরে। সারাদেশে এ ধরনের অনুমোদন দেয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শতাধিক। যারা এসব নিরাময় কেন্দ্র খুলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বও অধিদফতরের। কিন্তু তারা এই কাজগুলো করছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স নেই, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধাও। মানসিক রোগ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব। চিকিৎসার নামে অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে চলে শারীরিক নির্যাতন। মানসিক রোগী বলে তারা কারো কিছু বলতেও পারেন না, চিকিৎসার নামে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে- অভিভাবকরা তা জানতেও পারছেন না। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, লাইসেন্স দেয়ার আগে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যখন কোনো টিম পরিদর্শনে যায় তখন এসব হাসপাতালের মালিকরা ভাড়া করে চিকিৎসক-নার্সও আনে। এমনকি প্যাথলজিস্ট, টেকনিশিয়ান এবং যন্ত্রপাতিও ভাড়ায় নিয়ে আসে। এভাবেই চলে দেশের মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালগুলো।
তাই অনেকেই সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করছে। এসব হাসপাতালে ডাক্তার নেই, মানসিক চিকিৎসার কোনা ব্যবস্থা নেই। আছে কতগুলো টর্চার সেল। যেসব রোগীকে এরা সামলাতে পারে না, তাদের মারধর করে। এভাবেই ইচ্ছামতো চলে মানসিক হাসপাতাল। এতদিন এসব বিষয় সামনে আসেনি। বরিশাল মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম শিপনের নির্মম মৃত্যুর পরে সব যেন উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যে দৃশ্য এখানে দেখা গেল তা মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। হাসপাতালের নামে এ ধরনের বর্বরতা নজিরবিহীন। পিটিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হত্যায় অভিযুক্ত মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালটির মানসিক রোগী চিকিৎসার কোনো অনুমোদনই নেই। হাসপাতাল চালানোর মতো যে ধরনের বিশেষজ্ঞ মানসিক চিকিৎসক, কাউন্সেলর, জনবল, কাগজপত্র ও সুবিধা দরকার, এর কিছুই ছিল না।
ঢাকায় সবার চোখের সামনে দাঁড়ানো একটি হাসপাতালের কোনো বৈধতা না থাকার পরেও তারা দিনের পর দিন এ ব্যবসা চালাতে পারে কোন বলে সেটা বোধগম্য নয়! আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ মামলার এজাহারে বলেন, তিন-চার দিন ধরে হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায় আনিসুল। পরিবারের সবার মতামত অনুযায়ী আনিসুলকে চিকিৎসার জন্য গত সোমবার প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন। পরে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিন সকালে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখানে আনার পরেও আনিসুল হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আরিফ মাহমুদ জয় ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে দোতলায় নিয়ে যান। একইসাথে আনিসুলকে চিকিৎসার নামে দোতলার একটি অবজারভেশন কক্ষে নেয়া হয়। তারপরে চলে অকথ্য নির্যাতন।
এরপর দুপুর ১২টার দিকে আনিসুল নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তার স্বজনরা মেঝেতে নিথর আনিসুলকে পান। তখন তারা একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ কোন চিকিৎসা? বিশ্বের কোন দেশের রীতিতে আছে যে একজন রোগীকে ধরে এভাবে নির্যাতন করে মারা হবে? মৃত আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দিন আহম্মেদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তার ছেলেকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এই হাসপাতালের মতোই সারাদেশে মাদকাসক্তি ও মানসিক চিকিৎসার নামে নৈরাজ্য ও নির্যাতনের চিকিৎসা চলছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই লাইসেন্স। যারা লাইসেন্স নিয়েছে তারাও পরিচালনার শর্তগুলো মানছে না। মনগড়া চিকিৎসার নামে আটকে রেখে নির্যাতন এবং ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করে রাখা হয় সেখানে।
গত ১০ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন ও অপচিকিৎসায় কমপক্ষে ৫০ জনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা চিকিৎসার নামে নির্যাতনে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। আমরা মনেকরি মাদকদ্রব্য অধিদফতর যদি এসব হাসপাতালের দেখভাল করতে না পারে, তাহলে এসব হাসপাতালের অনুমোদন বন্ধ করে দেয়া জরুরি। এই পরিকল্পিত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সাথে সারাদেশের হাসপাতালগুলোকে জবাবদিহিতার ভেতরে আনা উচিত।
লেখক: চাকুরীজীবী

