তৈরি পোশাক: চীন থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হচ্ছে বাংলাদেশে

তৈরি পোশাক: চীন থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হচ্ছে বাংলাদেশে
গার্মেন্টস শ্রমিক /প্রতীকী ছবি

রাজিব চৌধুরী । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫

চীন থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হয়ে বাংলাদেশে আসার গতি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। শুধু চীন নয়, ক্রয়াদেশ সরে আসছে এমন দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও। মূলত আমেরিকার ক্রেতারাই ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছে বেশি। দেশটির বড় পোশাক ক্রেতাদের মধ্যে আছে ওয়ালমার্ট, ভিএফ (কন্তুর), গ্যাপ, জেসিপেনি, ক্যালভিন ক্লেইন, টমি হিলফিগার। তাদের প্রায় সবাই ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি ইউরোপভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হচ্ছে ওভেন ও নিট পোশাক—দুই ক্ষেত্রেই।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাহ অ্যাপারেলস সম্প্রতি স্পেনের একটি বাস্কেটবল দলের অফিশিয়াল ফ্যান জার্সির ক্রয়াদেশ পেয়েছে। স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদের বাস্কেটবল দলের সমর্থকরা এ জার্সি পরবেন। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি জার্সি তৈরিতে ব্যবহার্য কাপড়ও বাংলাদেশের কোনো কারখানা থেকে সরবরাহ নিতে আগ্রহী। এরই মধ্যে বাংলাদেশের স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত জার্সির কাপড়ও পছন্দ করেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ধরনের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আগে খুব বেশি আসেনি। যেগুলো এসেছে, সেগুলোর কাপড় আমদানি করতে হতো চীন থেকে।

পোশাক শিল্প মালিকদের দাবির সঙ্গে মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনার তথ্যও। নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের এক্সটারনাল ইকোনমিক্স শাখা থেকে প্রকাশ পায় তৈরি পোশাকের প্রান্তিক পর্যালোচনা শীর্ষক প্রতিবেদন। চলতি মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের এ ধারা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুনে রফতানি বৃদ্ধি পেলেও গতি ছিল মন্থর। সেই গতি বাড়তে শুরু করে সেপ্টেম্বরে। চলমান কভিড মহামারীতেও ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রফতানি ছিল অনেক বেশি উৎসাহব্যঞ্জক। বৈশ্বিক লকডাউন শিথিল হওয়ার পর ক্রেতারা ক্রমেই ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে তুলা ও সুতার মতো কাঁচামালের দাম, অস্বাভাবিক পরিবহন খরচ, ক্রয়াদেশ বাতিলের মতো সমস্যাগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যে ক্রয়াদেশগুলো যেত, সেগুলো এখন পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কারখানাগুলো আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ পাচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসেও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। ইউরোপের ক্রেতারাও ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিচ্ছে, তবে তা বড় আকারে এখনো বাংলাদেশে আসতে শুরু করেনি। স্থানান্তরের যে গতি সেটা এপ্রিল পর্যন্ত গড়াবে।

পোশাক শিল্প মালিকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির একটা প্রবণতা আছে। এ বৃদ্ধির পুরোটাই স্থানান্তর না। অর্থাৎ ক্রয়াদেশ যে বাড়ছে তার মধ্যে চাহিদা বৃদ্ধি ও স্থানান্তর দুটোই আছে। স্থানান্তর হচ্ছে মূলত যে ক্রয়াদেশ চীনারা পেত সেটা। এছাড়া কিছুটা ভিয়েতনাম থেকেও হয়েছে। দেশটিতে কভিডের প্রভাবে লকডাউন কার্যকর হওয়ার ফলে তখন ক্রয়াদেশগুলো বাংলাদেশে সরে এসেছে। সামগ্রিকভাবে ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির যে গতি, তা কভিড-পরবর্তী অতিরিক্ত চাহিদার কারণে। ক্রেতাদের মজুদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ক্রয়াদেশ হঠাৎ করেই বেড়েছে। একটা পর্যায়ে উপচে পড়েছে।

বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, স্থানান্তর মূলত হয়েছে যে ক্রয়াদেশগুলো চীনে যেত সেগুলো। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। চীন যে ধরনের পণ্য করত, সেগুলোর কিছু আমরাও করতে শুরু করেছি। ফলে বাংলাদেশে এখন নতুন অনেক ধরনের পোশাক পণ্য তৈরি হতে শুরু করেছে, যেটা আগে হতো না। স্থানান্তর এখনো অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের স্নায়ুযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ গতি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। আর ক্রেতারা একবার সন্তুষ্ট হলে এগুলো পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশেই আসবে বলে আশা করা যায়। মালিকরাও এ বিষয়ে সচেষ্ট থাকবেন।

এদিকে পোশাক শিল্প মালিকদের আরেক সংগঠন বিজিএমইএ সদস্যরাও ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হওয়া অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছে, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যার বেশির ভাগই আগে করত চীন, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ইথিওপিয়া। ভিয়েতনাম থেকে স্থানান্তরের সাময়িক প্রবণতা ছিল মূলত দেশটিতে কভিডজনিত লকডাউনের কারণে। আর মার্কিন নীতির কারণে চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরে আসছে পর্যায়ক্রমে। এটা কতদিন টেকসই হবে তা ভবিষ্যতে বলা যাবে। ক্রয়াদেশ সরে আসছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের পক্ষ থেকে।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির প্রবণতায় কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা সে সম্পর্কে মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, এখন আমেরিকাতে মূল্যস্ফীতির গতি ঊর্ধ্বমুখী। ইউরোপে হলে আরো বেশি হবে। যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি আমেরিকা এবং ইউরোপ নিচ্ছে সেটা হলো রাশিয়া থেকে ফুয়েল কিনবে না। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি যে বাড়ল, এখন ভোক্তার আয় সীমিত, এখন তেলের খরচ যদি বেড়ে যায়, তাহলে ভোক্তার খরচের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়বে। যার ফলে পোশাকের মতো পণ্যে ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে। কতটুকু হবে তা সময়ই বলে দেবে।

বিজিএমইএ প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে স্থানান্তর হওয়া অব্যাহত আছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কী ঘটবে সেটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমেরিকা ও ইউরোপের ক্রেতারাই ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করে বাংলাদেশে নিয়ে আসছেন। চীন ও ভিয়েতনামে না গিয়ে সেগুলো বাংলাদেশে আসছে।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading