রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১০

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন হুমকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্কট শুধু এই দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, যার আশঙ্কা করা হয়েছিল যুদ্ধের শুরুতেই। ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান এবং ন্যাটো জোটের সদস্য হওয়া নিয়ে রাশিয়ার বিরোধিতা ছিল বহুদিন ধরে। রাশিয়ার বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে ইউক্রেনের পরিকল্পনার জের ধরেই মূলত নানা সঙ্কটের উৎপত্তি। কোন বৃহৎ শক্তির অস্তিত্ব যখন হুমকিতে পড়ে, তখন সে নিজেও শক্তি প্রয়োগ করে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ এটিকে কূটনীতির এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাশিয়া কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলোতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র-পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতিকে বিরাট হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। চলমান সংঘাতের কারণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে অর্থনীতির নানা খাতে।

চলমান সংঘাতের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে নানাভাবে জড়িত থাকা পশ্চিমা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নানবিধ সঙ্কটে পড়েছে ইতোমধ্যে। ইউক্রেনে হামলার প্রভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফার বিশাল অংশ আসে রাশিয়া থেকে। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রাশিয়ার ঋণ নেয়ার পরিমাণও কম নয়। ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার ব্যাংকগুলো থেকে দেশটিতে যথাক্রমে ২৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ও ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৬ বিলিয়ন, জাপান থেকে ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ও জার্মানির ব্যাংগুলো থেকে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেয়েছে রাশিয়া। আর্থিক ও জ্বালানি খাতের বাইরেও নানা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে যা ইতোমধ্যে ঝুঁকি ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এভাবে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়াও সার, এ্যালুমিনিয়াম, নিকেল ও প্যালাডিয়াম এর অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক দেশ হচ্ছে রাশিয়া। চলমান সংঘাতের কারণে পটাশের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে অনেকাংশে, যা খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, জানুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। বন্ড মার্কেটেও দেখা দিয়েছে এর বিরূপ প্রভাব। নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বন্ড। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে অনেকেই দ্রুততার সঙ্গে বন্ড বিক্রি করে দিচ্ছে, যা বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সামরিক পদক্ষেপের কারণে কোন বাজারে অধঃপতন হলে তার সম্মুখসারিতে থাকবে রাশিয়া ও ইউক্রেন। উভয় দেশেই ডলার বন্ডের পারফরম্যান্স খারাপ যাচ্ছে কয়েক মাস ধরেই। মস্কো ও তার মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা বাড়ায় নিরুৎসাহিত হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা।

বলাবাহুল্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যত তড়িঘড়ি করে সংঘটিত হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব এত দ্রুত উপলব্ধি করা হয়ত যাবে না। এর প্রভাব পড়বে ধীরে কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে। এ যুদ্ধে সর্বাগ্রে ইউক্রেনের ক্ষতির পরিমাণ কী হবে তা এখনই অনুমান করা অসম্ভব। এরই মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, রাশিয়া যত দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারবে বলে মনে করেছিল, বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ইউক্রেন যদি গেরিলা আক্রমণেই যুদ্ধ মোকাবেলা করে, তবে এ যুদ্ধ অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা এরই মধ্যে অনেক রকমের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে রাশিয়ার ওপর। পশ্চিমের আকাশপথ বন্ধ অথবা সীমিত রাশিয়া এ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য। সুইফট থেকে রাশিয়ান ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বাদ দেয়া হচ্ছে। ফিফা, ইউয়েফা, অলিম্পিকসহ অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে রাশিয়াকে বাদ দেয়া অনেকটাই নিশ্চিত। ক্রীড়া সংস্থা ও নামী-দামী ক্লাবগুলো রুশ কোম্পানি বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার স্পন্সরশিপ বাতিল করেছে। দেশটির পুঁজিবাজার নিম্নগামী।

ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্কটের প্রভাব এর মধ্যেই পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় রফতানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যার মধ্যে তৈরি পোশাক সবচেয়ে বেশি। আমদানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য, যার বেশিরভাগটাই খাদ্যপণ্য। এর আগের বছর রাশিয়ায় বাংলাদেশ রফতানি করেছিল ৪৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। অন্যদিকে আমদানি হয়েছে ৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য।

দুর্বল অর্থনীতির কারণে পণ্য চাহিদার ক্ষেত্রেও একটা প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবে ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও নানা সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। দ্রুত সমাধান না হলে এই সঙ্কটের বড় রকমের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব প্রায় সব ক্ষেত্রেই পড়ে। তাই জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন থেকেই বিভিন্ন ধরনের সতর্কতামূলক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading