বিজ্ঞান গবেষণায় কী অবস্থায় আছে বাংলাদেশ
মো. নাজমুল হোসাইন । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:২৩
গত বছরই আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করলাম, জাতি হিসেবে আমাদের বয়স ৫০ পেরিয়ে গেল। অর্ধশতক পেরিয়েও বিজ্ঞান গবেষণায় আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। তবে পরিস্থিতি পুরোটাই আঁধারে আচ্ছন্ন নয়, আলোর রেখাও আছে। মন ভালো করার মতো একটি খবর হলো, বাংলাদেশি গবেষকেরা হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ওপরের কথাটা আপনাদের বিশ্বাস না-ই হতে পারে। তাই চলুন, হিসাব দেখা যাক। বাংলাদেশ ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো স্কোপাস ইনডেক্সড বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যায় ১০ হাজারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। স্কোপাস হচ্ছে বিশ্বব্যাপী মানসম্মত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার অন্যতম ইনডেক্সিং ডেটাবেজগুলোর একটি এবং প্রকাশনার সংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ। উক্ত ডেটাবেজের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশি গবেষকেরা ১১ হাজার ৯২৬টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যায় দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২০ ও ২০১৯ সালে বাংলাদেশের উক্ত প্রকাশনার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯ হাজার ১০৯ ও ৮ হাজার ৩০২।
আমাদের শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ (জিডিপির শতাংশ) দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। এই হিসাব মাথায় রেখে বলা যায়, গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ও এর ক্রমবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের কিছু গবেষক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অন্তত গবেষণার চেষ্টা করে চলেছেন। তবে গবেষণায় দৃশ্যমান উন্নতির জন্য আরও ব্যাপকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণামুখী হওয়া একান্ত জরুরি।
অন্যদিকে শুধু গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা গবেষণার অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রায়োগিক/ফলিত গবেষণার পাশাপাশি আমাদের মৌলিক গবেষণাকে সমানভাবে উৎসাহিত করা দরকার। মৌলিক গবেষণার বিকাশ ছাড়া প্রায়োগিক গবেষণা পূর্ণতা পায় না। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন মৌলিক গবেষণা ও এর ব্যাপক বিস্তার। সমগ্র পৃথিবীতে সমাদৃত নেচার বা সায়েন্স জার্নালের সিংহভাগ গবেষণা মৌলিক গবেষণারই অংশ। প্রায়োগিক গবেষণা যেহেতু সরাসরি বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই বেশির ভাগ সময়ই আমরা মৌলিক গবেষণায় উৎসাহী হই না। এ কারণে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে আমরা তেমন অগ্রসর হতে পারিনি। আবার এ ক্ষেত্রে অনেক গবেষক আগ্রহী থাকলেও দেশে উন্নত মৌলিক গবেষণায় সুবিধার অপ্রতুলতার কারণে সামগ্রিকভাবে গবেষণার মানোন্নয়নে আমরা বেশ পিছিয়ে পড়ছি।
উদাহরণস্বরূপ, দেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন জীবের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচিত হলেও এর পরবর্তী প্রোটিওমিক্স (বৃহৎ পরিসরে প্রোটিনসম্পর্কিত গবেষণা) ও সেলুলার (কোষীয়) বায়োলজির গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গবেষণাগুলো বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে। তবে উন্নত বিশ্বে মৌলিক ও প্রায়োগিক—উভয় ক্ষেত্রেই সমানতালে গবেষণা এগিয়ে চলে এবং গবেষকেরাও প্রয়োজনে একে অন্যকে সহযোগিতা করেন। কারণ, তাঁদের উপলব্ধি এটাই যে মৌলিক গবেষণার অনুশীলন ছাড়া প্রায়োগিক গবেষণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কাজেই মৌলিক গবেষণার বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ব্যতীত শুধুমাত্র প্রায়োগিক গবেষণাকে প্রাধান্য দিলে অদূর ভবিষ্যতে গবেষণার মানে তেমন পরিবর্তন হবে না—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
২০০৮ সালে চীন ‘থাউজেন্ড ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম’ চালু করে। এ রকম উদ্যোগের ফলাফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে চীন, যার ফলাফল কারও অজানা নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় থেমে নেই। ভারতে এ রকম কিছু প্রকল্প চালু আছে, যার মধ্যে ‘রামালিঙ্গস্বামী রি-এন্ট্রি ফেলোশিপ’ অন্যতম। এই প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য হলো—মেধা পাচার প্রতিরোধ করে নিজ দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
যা হোক, আমরাও এগিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস বা নারীর ক্ষমতায়নেই নয়, বাংলাদেশ হবে বিজ্ঞান গবেষণাতেও অগ্রগামী একটি দেশের নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলোতে রাতদিন গবেষণায় মত্ত থাকবে একদল গবেষক/শিক্ষার্থী, যাদের চোখে থাকবে নিত্যনতুন আবিষ্কারের নেশা। একই সঙ্গে বিজ্ঞানে স্নাতকদের চাকরির ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে।
আমরা তো অনেক কিছুই দেখে শিখি। শিক্ষা ও গবেষণায় উন্নয়নে অনুকরণীয় অনেক ভালো উদাহরণ আমাদের আশপাশের দেশগুলোতেই রয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা চাইলেই তা অনুসরণ করতে পারেন। কেননা একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের অন্যতম হাতিয়ার, যা একটি দেশকে কয়েক যুগ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
লেখক: বিজ্ঞান গবেষক

