ই-নামজারিতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটিয়েছে বাংলাদেশ
তাপসী মণ্ডল । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নামজারির সিস্টেম একটি জটিল প্রক্রিয়া ছিল। এতদিন হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি মাড়িয়ে করা হতো নামজারি। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ই-নামজারিকে একটি বিপ্লবই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নামজারি নিয়ে সাধারণ মানুষের নানা মত ও অভিযোগে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছিল। ই-নামজারি আশার সঞ্চার ঘটিয়েছে। এখন নেই কোনো অভিযোগ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমির মালিক নিজেই ঘরে বসে আবেদন করছেন। সমাধানও পেয়ে যাচ্ছেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ অনলাইনে প্রক্রিয়াধীন আবেদনসহ মোট ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৪টি ই-নামজারি আবেদন পেয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪ লাখ ১৪ হাজার ৩১৯টি আবেদনের। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২২ লাখ ই-নামজারির আবেদনের মধ্যে ১৯ লাখের নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ২২ লাখ নামজারির আবেদন করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
ই-নামজারির ক্ষেত্রে ব্যক্তি আবেদনে বা এলটি নোটিশ প্রাপ্তির পর সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৮ কার্য দিবস, প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক হলে মহানগরীর জন্য ৯ কার্য দিবস ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ১২ কার্য দিবস এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার বিনিয়োগবান্ধব শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাত দিনের মধ্যে নামজারি সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়াও সাধারণ ক্ষেত্রে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জমির নামজারি সেবা পাচ্ছেন। ভূমি ব্যবস্থাপনায় এটাকে বিপ্লবই বলছে সবাই।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্রয়, উত্তরাধিকার বা যে কোনো সূত্রে জমির মালিক হলে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়। ভূমি জরিপকালে ভূমি মালিকের মালিকানা নিয়ে যে বিবরণ প্রস্তুত করা হয় সেটাই খতিয়ান।
ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ই-নামজারিসহ অন্যান্য সব ভূমিসেবার ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর একটি অংশ। ই-নামজারি কার্যক্রম ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ৭টি উপজেলায় পাইলট আকারে শুরু হয়েছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূমিসেবা সহজ করতে ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় চলমান উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করা হয়। ওই সভায় পাইলট আকারে গৃহীত ই-নামজারি সিস্টেমটি পর্যবেক্ষণ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় দ্রুত সারাদেশে ই-নামজারি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ভূমি সংস্কার বোর্ড উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে হার্ডওয়্যার সরবরাহসহ কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করে এবং এটুআই প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
পরে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে সারাদেশে একযোগে শতভাগ ই-নামজারি বাস্তবায়ন শুরু হয়। এখন তিনটি পার্বত্য জেলা ছাড়া উপজেলা ভূমি ও সার্কেল অফিসে এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি চালু রয়েছে। আগে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী জনগণকে ভূমি অফিসে গিয়ে মিউটেশনের আবেদন করতে হতো। এতে জনগণের সময়, অর্থ ও যাতায়াতে অনেক ব্যয় হতো। এখন ভূমি অফিসের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সহজেই নামজারির জন্য যে কোনো নাগরিক আবেদন করতে পারছেন। এতে সাধারণ মানুষেরই সুবিধা হচ্ছে। কমছে হয়রানি ও ঘুষ।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নামজারি আরো সহজ করতে দলিল মূলে নামজারি ও অনলাইনে নামজারি ফি প্রদানের ব্যবস্থা স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্লোগান ‘হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা’। এর ধারাবাহিকতায় নাগরিকরা তাদের দোরগোড়ায় কম সময়ে, কম খরছে ভূমিসেবা পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে ২০২০ সালের ১৬ জুন জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড-২০২০ বিজয়ী উদ্যোগের নাম ঘোষণা করে। বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয় ‘স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকাশ’ ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ইউনাইটেড ন্যাশনস পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড-২০২০ ও জাতিসংঘ জনসেবা পুরস্কার ২০২০ অর্জন করে।

