আতঙ্কের নাম ভাড়াটে খুনি
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪১
রাজধানীর শাহজাহানপুরের গত ২৪ মার্চ রাতের ঘটনা যেন সিনেমাকেও হার মানায়। হাজারো মানুষের মধ্যে প্রকাশে খুন হন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু। ভাড়াটে খুনির অতর্কিত গুলিতে প্রাণ হারান কলেজ ছাত্রী সামিয়া আফরান প্রীতি। দেশে এ এক নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। একই কায়দায় ঘটছে পৃথক পৃথক ঘটনাও। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত
মানুষ যা সিনেমায় দেখে অভ্যস্ত সেটাই যেন বাস্তবে প্রতিয়মান হলো। ভাড়াটে খুনি দিয়ে প্রকাশ্যে মানুষ মারা হচ্ছে। শাহজাহানপুরের ২৪ মার্চ রাতের ওই ঘটনা এখনও গোটা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কোনো ধরণের দুর্ঘটনা তো না এটা। একেবারে ময়দানে নেমে গুলি করে হত্যা। খুনি মাসুম মোহাম্মদ আকাশ যাকে টার্গেট করে এসে আক্রমণ চালায় শুধু তার প্রাণই নেয়নি সঙ্গে প্রাণ যায় কলেজছাত্রী প্রীতিরও। যা গোটা দেশের মানুষকে নাড়া দিচ্ছে বারবার। আশার কথা হচ্ছে মাত্র তিনদিনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ ওই খুনীকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। আর তখনই বেরিয়ে এলো সিনেমা সদৃশ দৃশ্যপট। খুনিকে যে ভাড়া করা হয়েছে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হত্যা করার জন্য। খুনী নিজের টার্গেটে সফল হওয়ার জন্য অনবরত গুলি করে ফলে টার্গেটের সঙ্গে প্রাণ যায় প্রীতিরও।
টাকা দিয়ে খুনী ক্রয় এখন এক নতুন আতঙ্ক: সিনেমায় দেখা যায় টাকা দিয়ে কাউকে খুন করার প্রয়াস। বাস্তবে এঘটনা তেমন একটা না দেখা গেলেও সম্প্রতি বেশ কিছু খুনের ঘটনায় এবিষয়টি নজরে এসেছে। শাহজাহানপুরের ঘটনা ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ’কিছু খুনে এর সাদৃশ্যতা পেয়েছেন। রাজধানীতে অতি সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছেন ডাক্তার, পথচারি। এছাড়াও অজ্ঞাত নামাদের হাতে সাংবাদিক খুনের অভিযোগ রয়েছে। সবকিছু পর্যবেক্ষণে বিশ্লেষকরা বলছেন এর মূলে রয়েছে ভাড়াটে খুনীদের হাত। পেছন থেকে কলকবজা নাড়ছেন অন্য কেউ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবিষয়ে তদন্ত জোরদার করে সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসাই প্রত্যাশা।

নাটের গুরুদের প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে হবে দ্রুত: যেহেতু খুনীকে ভাড়া করা হয়েছে, সেহেতু এর পেছেনের কলকবজা নাড়ছেন কেউ না কেউ। সুতরাং সেই নাটের গুরুদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা এখন সকলের দাবি। আর এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দ্রুত দিতে হবে। আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীও এই বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর। তারা তিনদিনেই খুনীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন যা জাতিকে কিছুটা হলেও আশাবাদী করেছে। এই নাটের গুরু কারা তা জানার আগ্রহ এখন সবার। এটা রাজনৈতিক কোনো ষড়যন্ত্র নাকি ভিন্ন কোনো আগ্রাসী মনোভাব তা বের করে আনতে হবে। টার্গেট করে যাকে খুন করা হয়েছে তিনি তো ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দলের নেতা। তাই যারা এর পেছনে রয়েছেন তারা তো নতুন কোনো ষড়যন্ত্রে লীপ্ত রয়েছেন সেটা তদন্ত সাপেক্ষে বের করতে হবে।

৫ দিন আগেই ‘কন্ট্রাক্ট’, তিনদিনের মাথায় টার্গেট: জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হত্যার জন্য ঘটনার ৫ দিন আগে ‘কন্ট্রাক্ট’ (চুক্তি) করে পেশাদার খুনি মাসুম মোহাম্মদ আকাশ। তিন দিন আগে সে নাম পায় কাকে খুন করতে হবে। ঘটনার আগের দিন টিপুকে কমলাপুরে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সে। হত্যাকাøের জন্য টাকা নয়, আগের কয়েকটি মামলা তুলে নেওয়াসহ বিশেষ সুবিধার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় তাকে। রবিবার (২৭ মার্চ) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপি’র (গোয়েন্দা) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। হাফিজ আক্তার বলেন, জাহিদুল ইসলাম টিপু ও সামিয়া আফরান প্রীতিকে গুলি করে হত্যাকারী শুটারের নাম মাসুম মোহাম্মদ আকাশ (৩৪)। সে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার কাইশকানি এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে। রাজধানীর পশ্চিম মাদারটেকের ৬০/১৫ বাসায় পরিবার নিয়ে থাকে সে। তার নামে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে। বগুড়া জেলা পুলিশের সহযোগিতায় ডিএমপি’র গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বগুড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।
দেশে শুটিং কিলিংয়ের ঘটনা তদন্তে মিলবে মোটিভ: কারা মাসুমকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছে জানতে চাইলে হাফিজ আক্তার বলেন, যারা কন্ট্রাক্ট দিয়েছে তাদের কয়েকজনের নাম সে বলেছে। টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, তার নামে মামলা তুলে নেওয়ার সুবিধার বিষয় থাকতে পারে। ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, অনেকদিন পর শুটিং কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। আমরা দিনরাত পরিশ্রম করেছি। শুটিং মিশনে অনেকগুলো গুলি ছোড়া হয়। মূল কিলার গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন তদন্তে জানা যাবে মোটিভ। আর কারা ছিল, কী কারণে খুন, পেছনে কারা জড়িত তা জানার চেষ্টা চলছে। অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে বলছেন মাসুমই টিপু হত্যার শুটার এমন প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, তদন্তে নিশ্চিত হয়েছি, সে কিলিং মিশনে ছিল। ঘটনার পর ৫/৬ ঘণ্টার মধ্যেই নিশ্চিত হই, কিলিং মিশনে সেসহ দুজন ছিল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। পালানোর সময় তার কর্মকাণ্ড, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোটরসাইকেলের ব্যবহার- এসব মিলিয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেপ্তার করেছি।

প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ অতপঃর পিছু নেয়া: হাফিজ আক্তার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শুটার আকাশ জানিয়েছে, ঘটনার আগের দিন ২৩ মার্চ জাহিদুল ইসলাম টিপুকে তার এজিবি কলোনির রেস্টুরেন্ট থেকে বাসায় যাওয়ার রাস্তায় অনুসরণ করে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বেশি লোকজন থাকায় সে ব্যর্থ হয়। ঘটনার দিন ২৪ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একজন ফোন করে মাসুমকে জানায়, টিপু তার অফিসে (রেস্টুরেন্ট) অবস্থান করছে। এ সংবাদ পেয়ে মাসুম জাহিদুল ইসলাম টিপুর রেস্টুরেন্টের কাছ থেকে টিপুকে অনুসরণ করা শুরু করে এবং গুলি করার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
কিন্তু টিপু অনেক লোকজনের মধ্যে থাকায় গুলি করতে না পেরে টিপুর গাড়ি অনুসরণ করে সে। গাড়িটি শাহজাহানপুর রেল লাইনের আগে আমতলা সংলগ্ন রাস্তায় যানজটে আটকা পড়লে মাসুম গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা টিপুকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি করে। টিপুর মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় সে।
কেবল টিভির ব্যবসার আড়ালে পেশাদার খুনী: পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রাফিকস আর্টস নিয়ে লেখাপড়া করে মুগদা এলাকায় কেবল টিভির ব্যবসা করতেন খুনী আকাশ। তার স্ত্রী, সন্তান আছে, বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আকাশের নামে আরও মামলা আছে। আকাশ বলেছিল সে ফেরারি, চারপাঁচটা মামলা আছে তার নামে, সেসব নিয়ে ফ্রাস্টেটেড ছিল। তবে সেটা ভেরিফাই করতে হবে। আমরা একটা মামলার তথ্য পেয়েছি। কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান প্রীতি হত্যার ঘটনায় শুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশ বলেছে, আমার টার্গেট ছিল টিপুকে হত্যা করা। তাই আমি অস্ত্রের ট্রিগার চেপে রেখেছিলাম। একাধারে গুলি বের হচ্ছিল। প্রীতিকে টার্গেট করে গুলি করিনি। প্রীতির শরীরে যে গুলি লেগেছে সেটা আমি জানতাম না। হত্যার পরের দিন টিভি দেখে জেনেছি। তাকে আমি গুলি করতেও চাইনি। আমার টার্গেট ছিল কেবল টিপু।
টাকা নয় হত্যার বিনিময়ে মামলা থেকে বাঁচানোর প্রলোভন: এই হত্যাকান্ডের জন্য তাকে কন্ট্রাক্ট করা হয়েছিল টাকা দিয়ে নয়, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কন্ট্রাক্ট করা হয়। তার বিরুদ্ধে চার-পাঁচটি মামলা রয়েছে। একটি হত্যা মামলাও রয়েছে। তাকে সেসব মামলা থেকে সেভ করা হবে বলা হয়েছিল।

দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেও ব্যর্থ: ঘটনার পর দুই বন্ধুর সহযোগিতায় নিরাপদ স্থানে আত্মগোপনে যায় শুটার মাসুম। পরে সে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিরপরাধ রিকশা আরোহী প্রীতি এবং টিপুর মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পায়। এরপর সে জয়পুরহাট চলে যায়। সেখান থেকে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পার হতে না পেরে বগুড়ায় যায় সে। সেখানে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বগুড়া জেলা পুলিশের সহযোগিতায় মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে জাহিদুল ইসলাম টিপু মাইক্রোবাসে করে শাহজাহানপুর আমতলা হয়ে বাসায় ফিরছিলেন। শাহজাহানপুর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে জাহিদুল ও তার গাড়িচালক মুন্না গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় জাহিদুলের গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী প্রীতিও গুলিবিদ্ধ হন। তাদের রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল ও প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলিবিদ্ধ গাড়িচালক মুন্না বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় পরের দিন শুক্রবার (২৫ মার্চ) দুপুরে নিহত জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রী ফারজানা ইসলাম ডলি বাদী হয়ে শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১৮।

