কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত নিশ্চিত হোক পর্যটনবান্ধব পরিবেশ
আতোয়ারা আসমাউল তমা । সোমবার, ২৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:০০
কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের গর্বের অনুষঙ্গ। অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হচ্ছে এ সৈকতের পরিবেশ। পদ্মা সেতু চালু হলে কুয়াকাটার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজতর হবে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহজে কুয়াকাটায় ছুটে আসার সুযোগ পাবেন। একই জায়গায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় বলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে কুয়াকাটা সৈকতের কদর আলাদা।
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে সাগরকন্যা খ্যাত অপরূপ এক জায়গা কুয়াকাটা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত এ জায়গায় আছে বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কুয়াকাটায় আছে বেড়ানোর মতো আরও নানান আকর্ষণ।
কুয়াকাটার বেলাভূমি বেশ পরিচ্ছন্ন। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এ সৈকত থেকেই কেবল সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সৈকতের পূর্ব প্রান্তে গঙ্গামতির বাঁক থেকে সূর্যোদয় সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়। আর সূর্যাস্ত দেখার উত্তম জায়গা হল কুয়াকাটার পশ্চিম সৈকত। কুয়াকাটার সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সৈকত লাগোয়া পুরো জায়গাতেই আছে দীর্ঘ নারিকেল গাছের সারি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে এ বনেও। বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রের জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় ভাঙনের কবলে পড়েছে সুন্দর এই নারিকেল বাগান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে সারা বছরই দেখা মিলবে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে আছে জেলে পল্লী। এখানে প্রচুর জেলেদের বসবাস। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এখানে চলে মূলত শুঁটকি তৈরির কাজ। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে এনে সৈকতেই শুঁটকি তৈরি করেন জেলেরা। কম দামে ভালো মানের শুঁটকিও কিনতে পাওয়া যায় এখানে। কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত শেষ হয়েছে পূর্ব দিকে গঙ্গামতির খালে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে গঙ্গামতির জঙ্গল। অনেকে একে গজমতির জঙ্গলও বলে থাকেন। নানান রকম বৃক্ষরাজি ছাড়াও এ জঙ্গলে আছে বিভিন্ন রকম পাখি, বন মোরগ-মুরগি, বানর ইত্যাদি।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূবদিকে গঙ্গামতির জঙ্গল ছাড়িয়ে আরও সামনে গেল আছে ক্রাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ। এ জায়গায় আছে লাল কাঁকড়ার বসবাস। নির্জনতা পেলে এ জায়গার সৈকত লাল করে বেড়ায় কাঁকড়ার দল। ভ্রমণ মৌসুমে (অক্টোবর-মার্চ) কুয়াকাট সমুদ্র সৈকত থেকে স্পিড বোটে যাওয়া যায় ক্রাব আইল্যান্ডে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম পাশে নদী পার হলেই সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, নাম তার ফাতরার বন। সুন্দরবনের সব বেশিষ্ট এ বনে থাকলেও নেই তেমন কোন হিংস্র প্রাণী। বন মোরগ, বানর আর নানান পাখি আছে এ বনে। কদাচিৎ এ বনে বুনো শুকরের দেখা মেলে। কুয়াকাটা থেকে ফাতরার বনে যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়।
সারা বছরই পর্যটকের ভিড় থাকে এ সৈকতে। কুয়াকাটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ বিহারে অষ্টধাতুর তৈরি ৩৭ মণ ওজনের ধ্যানমগ্ন গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, সবুজ বেষ্টনী, সৈকতে ঢেউয়ের খেলা, লাল কাঁকড়া, লেম্বুর চর, লতাচাপলী সৈকত, ঝাউবন, ইকো পার্ক, প্রাচীন আমলের বিশাল কাঠের বজরা, কেরানীপাড়ার রাখাইন পল্লীসহ আশপাশ এলাকা ঘুরে মন জুড়িয়ে যায় পর্যটকদের। দৃষ্টিনন্দন সমুদ্রসৈকতে বস্তির মতো সারি সারি খুপরি, দোকান ও বাঁধে টং ঘর গড়ে ওঠায় বিরক্ত হচ্ছেন পর্যটকরা। সৈকতের ডান দিকে প্রশাসনের উচ্ছেদ করা ভাঙা কাঠের খুপরি আবার গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কোনো বাধা ছাড়াই। যত্রতত্র টং ঘর ওঠানো হচ্ছে সৈকতে। সৈকত লাগোয়া বাঁধের পাশে ডান দিকে গড়ে উঠেছে একাধিক খুপরি। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটার আকর্ষণ বাড়াতে সৈকত ও সংলগ্ন এলাকায় পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা গড়তে না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার জন্য মানসম্মত হোটেল-রেস্তোরাঁ নির্মাণের উদ্যোগও নিতে হবে। বখাটেদের উৎপাত থেকে সৈকত এলাকা মুক্ত রাখার বিষয়টিও জরুরি।
লেখকঃ ছাত্রী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

