স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণ: বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ

স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণ: বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ

অঞ্জন সরকার । মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:০২

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তথা গত বছর সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ এক অনন্য নজির স্থাপন করে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীর দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। আগামী পাঁচ বছর এ অর্জন ধরে রাখতে পারলে তথা প্রস্তুতিকালীন সময় কাটানোর পর ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ তথা এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। করোনাকালে চারদিকে যখন নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি, ঠিক তখন সাফল্যের এ খবর পুরো জাতির জন্য গর্বের বিষয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডের সবকটিতেই প্রয়োজনীয় শর্তাবলি তথা যোগ্যতা অর্জনকারী একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। কেননা এর আগে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণপ্রাপ্ত কোনো দেশই নির্ধারিত মানদণ্ডের দুটির বেশি যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের তিনটি সূচক হলো- এক. মাথাপিছু আয়; দুই. মানবসম্পদ সূচক; তিন. অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক।

এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা হিসেবে মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড এক হাজার ২২২ ডলার বা তার বেশি। এক্ষেত্রে গত তিন বছরে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮২৭ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে যোগ্যতা নিরূপণের স্কোর হলো ৬৬ বা তার বেশি। সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ৭৫ দশমিক ৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে যোগ্যতা অর্জনের স্কোর হলো ৩২ বা তার কম। এ মানদণ্ডে বাংলাদেশের স্কোর ২৭। নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডের সব শর্ত পূরণ করায় বাংলাদেশ চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ইউএন-সিডিপি’র ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করে।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে সম্মানের সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্বল হওয়ার পাশাপাশি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাঙালির নাম আরও একবার জোরেশোরে উচ্চারিত হলো। এর ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, রপ্তানির বহুমুখীকরণের ফলে নতুন নতুন বাজার তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। আগামীতে যখনই হোক না কেন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিকল্প ছিল না বাংলাদেশের। কেননা সব দেশই চায় এগিয়ে যেতে। তবে প্রথম দিকে সাময়িক সমস্যা হলেও সব দেশই চাইবে বিশ্বের বুকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ফলে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা, ওষুধশিল্পের পেটেন্ট প্রটেকশন প্রদান সুবিধা, ভর্তুকি প্রদানের সুবিধা, সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সহায়তার মতো বিষয়গুলো আর নাও থাকতে পারে, যদিও বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তবে প্রস্তুতিকালীন এই পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে এখন সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যার যার সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজারে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। মানবাধিকার রক্ষা ও সব ক্ষেত্রে সুশাসন রক্ষায় নজর দিতে হবে। বৈষম্য কমাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অভিন্ন উন্নয়নের প্রসার ঘটাতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্প তথা এক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে রপ্তানির বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। ব্যক্তি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের মতো বিষয়গুলো জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দূষণ রোধে বিশেষ ভূমিকা নিলে তা গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ সার্বিক জীবনমানে ভূমিকা রাখবে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় যত বেশি সক্ষমতা বাড়বে তত বেশি জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। বাংলাদেশ আগামীতে উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে যেতে বদ্ধপরিকর। নতুন প্রজন্মই পারে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে উন্নত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading