শিশুর হাতে ইন্টারনেট অভিশাপ না আশীর্বাদ
ফারিহা রহমান জেবা । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫
করোনার কারণে শিশুরাও এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে ক্লাস ও পড়াশোনা করছে। তবে ইন্টারনেটের যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি খারাপ দিকও রয়েছে। তাই শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেটের সুবিধা দেওয়া আমাদের সবার কর্তব্য। ইন্টারনেটের অধিক ব্যবহার আমাদের সময় নষ্ট করে। ইন্টারনেটে অনেক ধরনের গেম পাওয়া যায়। শিশুরা এসবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পাবজি, ফ্রি-ফায়ারের মতো গেমগুলোয় শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। এতে করে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। পড়াশোনায় মনোযোগ আসছে না।
শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। শিশুর ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, ইন্টারনেট কোনো গোপন জিনিস নয় যে বদ্ধ ঘরে দেখতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে যেন শিশু নির্দ্বধিায় তার সবকিছু অভিভাবকের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, এতে যেন কোনো সংকোচ বোধ না থাকে।
শিশু ইন্টারনেটে কী করছে বা কী শিখছে, তা গল্পচ্ছলে জেনে নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি জরুরি। এখন নানা ধরনের সফটওয়্যার (অ্যান্টিভাইরাস) পাওয়া যায়, যাতে ইন্টারনেটে শিশুর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা যায়। আবার শিশু কী কনটেন্ট দেখবে, তাও নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কার্টুন, ভিডিও দেখাসহ ইন্টারনেট ভিত্তিক নানা ধরনের আসক্তি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে এসব শিশুর মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ইন্টারনেট কনটেন্ট দেখায় লাগাম টানতে হবে। দিনে এক-দুই ঘণ্টার বেশি যেন তারা ইন্টারনেটে ভিডিও না দেখে তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে উচ্চমাত্রায় অনলাইনে প্রবেশাধিকারে সুযোগ ও ব্যবহারের দিক থেকে ছেলেরা (৬৩ শতাংশ) মেয়েদের (৪৮ শতাংশ) চেয়ে এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডি দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। অনলাইনে হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অনলাইনে অনির্দিষ্টকাল ধরে এগুলো থেকে যেতে পারে। অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় যারা অনলাইনে ভয়ভীতির শিকার হয়, তাদের অ্যালকোহল ও মাদকে আসক্ত হওয়ার এবং স্কুল ফাঁকি দেওয়ার হার বেশি।
অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ব্যাঘাত ঘটে। সবসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ জ্বলে, মাথাব্যথা করে, দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। বর্তমানে আমরা লক্ষ করে থাকি, শিশুদের চোখে চশমার ব্যবহার বেশি। আবার শিশুরা মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবসময় ইন্টারনেটে গেম খেলা, ভিডিও দেখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকায় তারা মাঠে খেলতে যায় না। এভাবে তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। আপনজনের সঙ্গে সময় কম কাটায় তারা। সবসময় ঘরে বন্দি জীবনযাপন করে, ফলে তাদের মেজাজ রুক্ষ হয়ে যায়। অনেক শিশু সাইবার ক্রাইমেরও শিকার হয়। অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে, ছবি আদান-প্রদান করে, অনেক সময় ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হয়। শিশুরা ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অবগত না হওয়ায় এমন ভুল করে থাকে। এমনকি অনেক সময় খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। অনেকে কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে শিশুরা অসামাজিক হয়ে পড়ছে। কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। তারা বাঙালি সংস্কৃতিচর্চা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট ভিত্তিক অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। আবার অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমে পরিবর্তন আসে। তারা সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করে না এবং পুষ্টিকর খাবার খায় না। অনেক শিশু রাত জেগে ইন্টারনেট চালায়। তাদের রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। ফলে সকালের সব কাজে তাদের ব্যাঘাত ঘটে। সারাদিন ক্লান্তি অনুভব করে। তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা যেন অতিরিক্ত সময় ইন্টারনেটে ব্যয় না করে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে শিশুরা কীভাবে ইন্টারনেট চালায়, ইন্টারনেটে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, কাদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের ভালো-মন্দ জ্ঞান বুঝিয়ে দিতে হবে। শিশুদের জন্য সময় দিতে হবে।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক
ইউডি/অনিক

