রাজধানীর যানজট: নিরসনে দরকার জরুরি পদক্ষেপ
মীর আব্দুল আওয়াল । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
রাজধানী ঢাকায় দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে যানজট। তীব্র যানজটের ভোগান্তিতে পড়ছে নগরবাসী। কয়েক দিন ধরেই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শিক্ষার্থীদের পুরোদমে ক্লাস শুরু হয়। সেইদিন যানজটে মূলত অচল হয়ে পড়ে পুরো ঢাকা। স্কুল খোলার দ্বিতীয় দিনেও তীব্র যানজটের কারণে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। গন্তব্যে যেতে দীর্ঘ সময় লাগছে যাতায়াতকারীদের। সকাল থেকেই বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলে ছিল ধীর গতি। যানজটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে অফিসগামী ও স্কুলগামীরা। বিশেষ করে বিভিন্ন স্কুলের সামনে ছিল তীব্র যানজট।
অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে হেঁটেই গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তীব্র গরম ভোগান্তিতে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, অনেক দিন পর স্কুল খুলেছে। অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে গাড়িতে স্কুলে যাচ্ছেন। যত্রতত্র পার্কিং করছেন। এসব কারণেই যানজট বাড়ছে। তবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা দেখা গেছে।
যানজটের কারণে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন লক্ষ করা যায় রাজধানীর সড়কের একটি বড় অংশজুড়ে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল লোড-আনলোড করা হচ্ছে; সড়কের উপর গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়েছে; আবার অনেকে সড়কের উপরই পসরা সাজিয়ে বসেছে। রাজধানীতে সড়কের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কম সড়কে বেশি যানবাহন চলাচল যানজট বৃদ্ধির একটি কারণ বটে। সড়কের বিশৃঙ্খলাও যানজটের একটি বড় কারণ। এছাড়া সড়কে রয়েছে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সড়কে বিশৃঙ্খলা এড়াতে কর্তৃপক্ষ কোনো রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করলে পরিস্থিতির অবনতি হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশৃঙ্খলাজনিত কারণে অনেকে দুর্ঘটনারও শিকার হচ্ছেন। বস্তুত এ নগরীতে বেশিরভাগ যানবাহনই নিয়ম মেনে চলাচল করে না। গণপরিবহণের চালকরা যেখানে-সেখানে যানবাহন থামিয়ে যাত্রী তোলে ও নামায়। আবার কোথাও বা নিজেদের ইচ্ছামতো আড়াআড়িভাবে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকায় চালক-যাত্রীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা নানা রোগের উৎস হিসাবে কাজ করে। যানজটের কারণে রাজধানীবাসীর আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও আলোচিত। দিন দিন যানজট পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে এসব ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধানে সড়কের সংখ্যা ও পরিসর বাড়ানোর কাজটি কঠিন। যানজট রাজধানীর নগর জীবনকেই শুধু বিপর্যস্ত করে তুলছে, তা নয়, ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য হিসেবেও পরিচিতি এনে দিয়েছে। যানজট সমস্যার সমাধানে আরো বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে।
এ নির্মাণ কাজের জন্য ব্যস্ত সড়কের একাংশ ব্যবহৃত হওয়ায় ধারে কাছের সব সড়কে যানজট অনিবার্য হয়ে উঠছে। নির্মাণ কাজের শম্বুকগতি মানুষের ভোগান্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। যানজটে এমনই অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে যে, আধাঘণ্টা দূরত্বের সড়ক অতিক্রম করতে গড়ে ৭-৮ গুণ পর্যন্ত সময় লাগছে। বলা হয়, রিকশার পাশাপাশি প্রাইভেট কারের আধিক্য অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে। তবে অভিজ্ঞজনদের মন্তব্য, ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা যানজটের জন্য প্রধানত দায়ী। ঢাকার রাজপথের এক বড় অংশ অবৈধ দখলদারদের দখলে চলে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবৈধ দখলদারিত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক টাউট, পাড়া-মহলার মস্তান এবং পুলিশের সম্পর্ক থাকায় রাজধানীর সড়কগুলো দখলমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই যানজট সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। মানসম্পন্ন গণপরিবহণের অভাবে রাজধানীতে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এভাবে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আগামীতে রাজধানীতে মানুষের হাঁটার গতির তুলনায় গাড়ির গতি কমবে, এমন আশঙ্কা প্রবল। রাজধানীর বিপুলসংখ্যক যাত্রী-চালক অসচেতন, অনেকে উদাসীন; কেউ কেউ বেপরোয়া। এ অবস্থায় সড়কে কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। মোট কথা, রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
যানজট নিরসনে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে কিছু অবকাঠামো নির্মাণেই যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীতে মেট্রোরেল প্রকল্প এগোচ্ছে মন্থরগতিতে। পরিশেষে বলব, অবৈধ গাড়ি পার্কিং, ফুটপাত দখল করে রাস্তা সঙ্কীর্ণ করা থেকে জনগণকে বিরত রাখতে হবে। নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণের স্বার্থে যানজট নিরসনে অচিরেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই প্রত্যাশিত।
লেখকঃ সাংবাদিক
ইউডি/অনিক

