‘কালো মানিক’ পেলে: ফুটবল ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত সম্রাট

‘কালো মানিক’ পেলে: ফুটবল ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত সম্রাট

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫০

ক্রিকেটে যেমন ব্রাডম্যান, হকিতে যেমন ধ্যানচাঁদ, তেমনই ফুটবলের বাদশা হলো ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী পেলে। কেউ কেউ ম্যারাডোনাকে তার প্রতিস্পর্ষী বলে থাকেন। কিন্তু বিশ্বের সমস্ত ফুটবলপ্রেমী মানুষদের মধ্যে একটি ভোটের আহ্বান করা হলে দেখা যাবে শতকরা ৭০ জন ফুটবল প্রেমী হয়তো পেলেকেই নির্বাচিত করবেন ফুটবলের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসাবে। পেলে ব্রাজিলের হয়ে ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ফুটবলের বাদশা পেলে’র সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল অনিক

ছোট থেকেই খেলার প্রতি অদম্য আকর্ষণ
ব্রাজিলের বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় পেলের পূর্ণ নাম এদসোঁ আরাঁচ দু নাসিমেঁতু। পেলে তার ডাকনাম। তিনি জন্মেছিলেন ব্রাজিলের ট্রেস কেরাকোয়েস অঞ্চলে ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। খেলাধুলার প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ ছিল পেলের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। নিরন্তর দারিদ্রতার আঘাত ছিল, ছিল অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তবুও সারাদিন ফুটবল মাঠে থাকতে ভালোবাসতেন পেলে। তখন তার বয়স মাত্র তেরো বছর।

বাবা ডন্‌ডিনহো ছিলেন একজন ফুটবল খেলোয়াড়। ক্লাব স্তরে দারুণ খেলা খেলে গেছেন। একবার ক্লাব ম্যাচ খেলতে গিয়ে দারুণ আঘাত পেলেন। শেষ পর্যন্ত আর মাঠে নামতে পারলেন না। অভাব আসলো সংসারে। ছেলেকে বাবার মতো খেলতে দেখলে মা ভীষণ রেগে যেতেন। কারণ তিনি জানেন এই খেলা থেকেই তার সংসারে এত অন্ধকার। কিন্তু ব্রাজিল দেশটার সঙ্গে ফুটবল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

ব্রাজিলের আকাশে বাতাসে আছে ফুটবল। আছে মানুষের চিন্তা ভাবনায় নিশ্বাস–প্রশ্বাসে, আছে বড়ো লোকের উল্লাস এবং গরীবের বেঁচে থাকার লড়াইতে। ব্রাজিলের হাজার হাজার নিরন্ন অসহায় মানুষ ফুটবলের মধ্যে আত্মার মুক্তি খুঁজে পান। কাজেই চাইলেই ফুটবল থেকে দূরে থাকা সম্ভব না ব্রাজিলে।

“সমবয়সী ছেলেরা আমাকে পেলে, পেলে বলে খেপাত। বোধ হয় ওরা আমাকে গেঁইয়া ভূত বলে রাগাবার চেষ্টা করত। এ নিয়ে প্রায়ই ওদের সঙ্গে মারামারি হত। কিন্তু আশ্চর্য, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দেওয়া বিদ্রপের এই নামেই আমি খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, যশ, অর্থ সবকিছু পেয়েছি।”

পেলে নামের অর্থ
পেলে শব্দটির মধ্যে একটা আলাদা অর্থ লুকিয়ে আছে। ছোট্টবেলায় ফুটবল মাঠে পেলে যখন তখন হাত দিয়ে কান ধরে ফেলতেন। তাই সমবয়সী বন্ধুরা তাকে ‘পে লে’ বলে খেপাত। পোর্তুগিজ ভাষায় পে কথাটার মানে হল পা, আর তুর্কি ভাষায় লে কথাটির মানে হল মুখ। অর্থাৎ তারা পেলেকে এক মহামুর্খ খেলোয়াড় বলেই ভাবতেন।

পেলের ছদ্মনাম
পেলের অনেকগুলি ছদ্মনাম আছে। যেমন ডিকো, এডসন, কালো মুক্তো, ফুটবল সম্রাট ইত্যাদি। তবে পেলে নামটির মধ্যেই বোধ হয় একটা আশ্চর্য জাদু লুকিয়ে আছে। ছোটবেলায় ডিকো নামে বেশি পরিচিত ছিল পেলে।

ক্রীড়া জীবনের সূচনা
১৯৩০ সাল–ব্রাজিল বিশ্বকাপে দলের অন্যতম ফুটবলার ছিলেন ভাল্‌দেমার ডি ব্রিটো। পরে তিনি এক নামকরা পেশাদার কোচ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ছিলেন। কোচ হিসাবে ব্রিটোর খ্যাতি তখন আকাশচুম্বী। যেখানে নতুন প্রতিভার সন্ধান পেতেন, সেখানেই ছুটে যেতেন। ছোটোদের খেলা শেখাতে গিয়ে এলেন পেলের ক্লাব জুভেনাইল এ। তেরো বছরের কিশোরের ক্রীড়াকুশলতা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এই ছেলেটি নিজে নিজে এত ভালো খেলা শিখল কী করে?

তিনি বছর খানেকের বেশি তালিম দিলেন তাকে। তারপর তার ইচ্ছেতে পেলে সান্টোস ক্লাবের হয়ে খেলতে নামেন। সান্টোস একটি বিশ্ববিখ্যাত ক্লাব। সেখানে খেললে অনেক বেশি মানুষের সামনে আসার সুযোগ পাওয়া যাবে। সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে পরিচিত করানোর সুযোগ পাবে। অভিজ্ঞ কোচ বুঝতে পেরেছিলেন ছোট্ট পেলের মধ্যে অগ্নি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তাই তাকে ঠিক জায়গায় আনতে হবে।

পেলের রেকর্ড
প্রথম শ্রেণীর ফুটবলে ১৩৬৩ টি ম্যাচে ১২৮১ টি গোল করার অসাধারণ রেকর্ড করেছেন পেলে। ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই মাত্র সতেরো বছর বয়সে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে নেমেছিলেন পেলে। লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এই দুটি দেশ ফুটবলে মহাশক্তিধর। কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। তাই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে পেলে খানিকটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। সেই খেলাতে তিনি হয়তো ব্যক্তিগত প্রতিভার স্ফুরণ দেখাতে পারেননি, কিন্তু তার আবির্ভাব যে অনেক ডিফেন্ডারের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে, এমন একটা সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল তার খেলার মধ্যে।

পেলের অর্জন ও সন্মাননা
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১১১ টি ম্যাচ খেলে ৯৭ টি গোল করেছেন। ১৯৫৮ থেকে পরপর ৪ বার, অর্থাৎ ৬২, ৬৬ এবং ৭০ সালে বিশ্বকাপে খেলেছেন। তার ক্লাব বিশ্বক্লাব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে ১৯৬২, ১৯৬৩ সালে। ১৯৭০ সালে ছিলেন বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে দেশের হয়ে শেষবারের মতো ম্যাচে নেমেছিলেন। পেলে যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন সমবেত দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে শেষ বারের মতো সংবর্ধনা জানিয়েছিল।

অবসর জীবন
এই অবসরের সিদ্ধান্ত অবশ্য পরে পালটাতে বাধ্য হয়েছিলেন পেলে। যোগ দিয়েছেন নিউইয়র্কের কসমস ক্লাবে। তখনও তার পাসিং এবং শুটিং ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তাই বলা হয়ে থাকে পেলের মতো মহামূল্যবান খেলোয়াড় কখনো অবসর নিতে পারেন না।

অন্যান্য রেকর্ড
পেলের অনন্য নজিরের মধ্যে আছে বিশ্বকাপে ১৬ ম্যাচে ১২ গোল৷ ১৯৫৯ সালে ১০৩ ম্যাচে ১২৬ গোল করে অসাধারণ রেকর্ড করেছেন। গত শতকের সেরা ফুটবলার হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন সমস্ত সাংবাদিকদের মতে৷ এইভাবেই পেলে আজ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত সম্রাট হয়ে আছেন। যতদিন মানুষ ফুটবল খেলবে, ততদিন পেলেকে মনে রাখবে।

ইউডি/অনি

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading