টাইগারদের সাদা পোশাকের মলিনতা কাটবে কবে?
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৩ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশকে এখন আর আন্ডারডগ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না। একদিনের ম্যাচ তথা ওয়ানডে ক্রিকেটে তো টাইগাররা এখন এক পরাশক্তির নাম। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফরম্যাট টেস্ট ক্রিকেটে ঠিক ততটাই মলিন মুমিনুলদের পারফরম্যান্স। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জয় নতুন দিনের সূচনার ইঙ্গিত দিলেও সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সাদা পোশাকে অতীতকেই স্মরণ করল টাইগাররা। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এবারের সফরটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে আজীবন। কেননা, এই সফরের প্রথম ধাপে ওয়ানডে ক্রিকেটে অনেকগুলো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তামিম ইকবালের দল। সফরে প্রথমবারের মতো প্রোটিয়াদেরকে ওদের মাটিতেই হারানোর স্বাদ গ্রহণ করে টাইগাররা। পরবর্তীতে সেই জয়কে রাঙিয়ে দ্বিতীয় ধাপও পূরণ করে সাকিব-মুশফিকরা। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ওদের মাটিতেই ওয়ানডে সিরিজে হারায় বাংলাদেশ। যা নিকট অতীতে পারেনি এশিয়ার কোনো দল। অতি সম্প্রতি শক্তিশালী ইন্ডিয়াও সেখানে গিয়ে ধবলধোলাই হয়ে এসেছিল। কিন্তু এতো সব দারুণ স্মৃতি সাদা পোশাকে এসেই ম্লান হয়ে গেলো।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত দ্বিতীয় টেস্টে লজ্জাজনকভাবে হেরে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে হারার পর দ্বিতীয় টেস্টে ৩৩২ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয় মুমিনুল হকের দল। ব্যাটারদের ব্যর্থতার কারণে এমন পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না সমর্থকরা। দুই টেস্টের মধ্যে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে মাহমুদুল হাসান জয়ের সেঞ্চুরি ছাড়া বাংলাদেশের তেমন উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও ব্যর্থ সফরকারীরা। টেস্ট সিরিজে অনুপস্থিত ছিলেন সাকিব আল হাসান।
সাদা পোশাকে ধারাবাহিকতার বড়ই অভাব: ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর টাইগাররা কখনোই এই ফরম্যাটে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম জয় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৫ বছর। তাও তখনকার অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামের মাটিতে সেই টেস্ট জিতেছিলো বাংলাদেশ। পরবর্তীতে বেশকিছু ম্যাচে জয় আসলেও তা প্রায় কালেভাদ্রে।
ওয়ানডের টাইগাররা টেস্টে যেনো নিজেরাই প্রতিপক্ষ: বিশ্বক্রিকেটে ওয়ানডেতে এখন এক পরাশক্তির নাম বাংলাদেশ। এতোদিন ঘরের মাটিতে দাপট দেখালেও এখন বিদেশের মাটিতেও নিত্য ম্যাচ জিতে চলেছে সাকিব-তামিমরা। ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, উইন্ডিজের মতো দলকে হারানোর সঙ্গে রয়েছে বিদেশের মাটিতেও বহু জয়ের স্মৃতি। এছাড়া বিশ্বকাপেও টাইগারদের রয়েছে বড় বড় দলকে হারানোর অভিজ্ঞতা। কিন্তু সাদা পোশাকে যেনো বড্ড মলিন ওরা। এই ফরম্যাটে খেলার মানসিকতা দিনকে দিন মনে হয় হারিয়েই যেতে বসেছে। নেই কোনো সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। কিভাবে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে ম্যাচে টিকে থাকতে হয় সেটাই যেনো রপ্ত করতে পারেনি টাইগাররা।

আইসিসির ওয়ানডে সুপার লীগের শীর্ষে বাংলাদেশ: চলমান আইসিসির ওয়ানডে সুপার লীগের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ১৮ ম্যাচ খেলে ১২টিতেই জয় পেয়েছে টাইগাররা। আর এই অবস্থানই এই ফরম্যাটে টাইগারদের দাপট স্পষ্ট করে। বিশ্বকাপের অতীত রেকর্ড ঘাটলে দেখা যাবে ইন্ডিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তানের মতো পরাশক্তি টাইগারদের কাছে হারের স্বাদ পেয়েছে।
সাদা পোশাকের সুখস্মৃতি আর যত লজ্জা: এই ফরম্যাটে ধারাবাহিকভাবে জিম্বাবুয়েকে হারানোর রেকর্ড আছে টাইগারদের। আছে ওদের তিন ম্যাচের সিরিজে ধবলধোলাইয়ের লজ্জায় ফেলানোর রেকর্ডও। বড় জয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ঘরের মাঠে অষ্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকে হারানোর গৌরব। এছাড়াও জয় আছে উইন্ডিজের মাটিতে, শুধু তাই নয় ওদেরকে সেখানে ধবলধোলাইও করেছে টাইগাররা। শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের শততম ম্যাচে হারিয়েছে টাইগাররা। লজ্জার রেকর্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একেবারেই আনকোড়া দল আফগানদের সঙ্গে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ঘরের মাঠেই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে টাইগারদের।

১৩০ টেস্টে পরাজয় ৯৭ টিতেই, জয় এসেছে ১৬ বার: এই ফরম্যাটে টাইগাররা এখন পর্যন্ত ম্যাচ খেলেছে ১৩০টি। এর মধ্যে জয় এসেছে মাত্র ১৬ ম্যাচে। পরাজয় বরণ করতে হয়েছে ৯৭টি ম্যাচে। অপর ১৭টি ম্যাচ অমিমাংসীত ভাবে শেষ হয়েছে। দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র ম্যাচে হার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬ ম্যাচে ৫ হার, ১ জয়, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ম্যাচে ৯ হার, ১ জয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩ ম্যাচে ১২ হার ১ ড্র, ইন্ডিয়ার বিপক্ষে ১১ ম্যাচে ৯ হার ২ ড্র, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ম্যাচে ১ জয়, ৯ হার, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৪ ম্যাচে ১২ হার, ২ ড্র, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২২ ম্যাচে ১ জয়, ১৭ হারও ৪ ড্র, উইন্ডিজের বিপক্ষে ১৮ ম্যাচে ৪ জয়, ১২ হার ও ২ ড্র এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৮ ম্যাচে ৮ জয়, ৭ হার ও ৩ ড্র।
ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়ন ও মানসিকতা পরিবর্তন প্রয়োজন: ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, টেস্ট ক্রিকেট খেলার মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে প্রথমেই। এখানে ধৈর্য্য ও মনোবল সবার ঊর্ধ্বে। এছাড়াও ঘরোয়া ক্রিকেটের মানোন্নয়ন জরুরী। ভালোমানের উইকেট বানাতে হবে, সেখানে ব্যাটারদের জন্য সুবিধার সঙ্গে বোলারদের জন্যও সুবিধা রাখতে হবে। এছাড়াও বেশি বেশি এই ফরম্যাটে ম্যাচ খেলার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

নবীনদের পাশাপাশি অভিজ্ঞরাও ব্যর্থ যেখানে: প্রথম টেস্টে নবীন মাহমুদুল হাসান জয় দারুণ শতক হাঁকালেও ব্যর্থ হন পরের তিন ইনিংসেই। মুশফিকুর রহিম দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলেছেন ৮০ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে। কিন্তু তার এই অভিজ্ঞতার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। অথচ অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দলকে জয়ের বন্দরে নেওয়ার কথা মুশফিকের। সুইপ, স্লগ সুইপ, রিভার্স সুইপ, প্যাডেল সুইপ, স্কুপ- এসব খেলতে পারা যেকোনও ব্যাটারের জন্যই দারুণ স্কিলের পরিচয়। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার মুশফিক এই শটগুলোতেই বহু রান করেছেন। আবার এই শটগুলো খেলতে গিয়েই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আউট হয়ে বাংলাদেশ দলকে ফেলেছেন বিপদে। তামিম ইকবাল প্রথম টেস্টে একাদশে ছিলেন না, কিন্তু ২য়টিতে প্রথম ইনিংসে ভালো শুরু করলেও শেষ করতে পারেননি। লিটন দাসও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি এই সফরে। নবীন ইয়াসির রাব্বি নিজেকে প্রমাণের অপেক্ষায় লড়াই করছেন। আর নাজমুল শান্ত এখনও ভালো কিছুর অপেক্ষাতেই যেনো আছেন।
নেতৃত্বই কী চাপে ফেলছে ব্যাটার মুমিনুলকে: এদিকে টেস্ট ক্রিকেটের নেতৃত্ব পাওয়ার পর থেকেই চেনা ছন্দে নেই মুমিনুল। এই সফরে চার ইনিংসের একটিতেও দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। সর্বশেষ ১২ ইনিংসে রান ১৬৬; গড় ১৪! এই ১২ ইনিংসে দুই অঙ্কের ঘরেই মুমিনুল যেতে পেরেছেন মাত্র তিনবার। অন্যদিকে তিনবার রানের খাতা না খুলেই আউট হয়েছেন। এই সময়ে কোনও সেঞ্চুরি নেই টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ানের। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে মাউন্ট মঙ্গাইনুতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের ম্যাচে খেলেছিলেন ৮৮ রানের ইনিংস। তাহলে কি অধিনায়কত্ব মুমিনুলের ঘাড়ে চেপে বসেছে? অধিনায়ক হওয়ার আগে তার ক্যারিয়ার গড় ছিল প্রায় ৪১। অন্যদিকে ১৫ ম্যাচ অধিনায়কত্ব করে সেই গড় এখন নেমে এসেছে ৩৪-এ!

দলের আরও উন্নতি দরকার বলছেন মুমিনুল: দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা পোশাকে ব্যর্থতা নিয়ে বাংলাদেশি অধিনায়ক মুমিনুল হক বলেছেন সব সেশনেই ভালো খেলতে হবে এমন কোনো কথা নেয়। দলের আরও উন্নতি দরকার বলেও মনে করছেন তিনি। মুমিনুল হক বলেন, টেস্ট ক্রিকেট এমন একটা খেলা যেখানে আপনাকে প্রতিদিন উন্নতি করতে হবে দলগতভাবে। আপনি এক সেশন ভালো খেললে হবে না আবার পাঁচদিনের মধ্যে তিনদিন ভালো খেললে হবে না। আপনার পাঁচদিনে পাঁচদিন ভালো খেলতে হবে। আপনি একটা-দুইটা সেশন ভুল করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকটা সেশন ভালো খেলতে হবে। এসব জায়গায় আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে। মুমিনুল আরও বলেন, আপনারা হয়তো এমনভাবে বলছেন যেন আমরা একটা টেস্ট ম্যাচ জিতে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দল হয়ে গেছি। আমার একটা টেস্ট জিতে আগেও যেখানে ছিলাম এখনও সেখানে আছি। হয়তো আপনাদের প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের নিজেদেরও হয়তো বাড়ছে। আমাদের আরও উন্নতি করার জায়গা আছে। আরও অনেক জায়গায় উন্নতি করতে হবে।
ইউডি/সুপ্ত

