বর্ষ বরণে উৎসবের আমেজ: সম্প্রীতির বন্ধনে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রুখে দাঁড়াও কূপমণ্ডূকতা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৬:৪০
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ হ্যাঁ, সকল গ্লানি ভুলে নতুন শুরুর প্রত্যাশায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি আজ নতুন বছরকে বরণ করে নিবে। আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হলো নতুন বাংলা বর্ষ ১৪২৯। পয়লা বৈশাখ আমাদের সকল সঙ্কীর্ণতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবন-ব্যবস্থা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। মহামারির কারনে দু’বছর পর আজ বাংলা নববর্ষের বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত
পহেলা বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য। মোগল সম্রাট আকবর ‘ফসলি সন’ হিসেবে বাংলা সন গণনার যে সূচনা করেন- তা সময়ের পরিক্রমায় আজ সমগ্র বাঙালির কাছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক স্মারক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাঙালির যে কয়টি উৎসব আছে, তার মধ্যে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। গ্রামগঞ্জে তো বটেই, নাগরিক জীবনেও এখন জায়গা করে নিয়েছে এই উৎসব। আমাদের মনের ভিতরের সকল ক্লেদ, জীর্ণতা দূর করে নতুন উদ্যোমে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। নতুন ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেবে নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে হবে
ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সব পেশার, সব শ্রেণির মানুষের সার্বজনীন উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ। সাম্প্রদায়িকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সবাই মিলে একসাথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথেই হতে পারে পহেলা বৈশাখের বরণ যাত্রা। জাতিগতভাবে আমাদের ভেতরে যে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা, তা এখনো আমাদের সত্ত্বায় জেগে আছে। জেগে যে আছে, হারিয়ে যায় যে যায়নি, বাঙালী যে অসাম্প্রদাকিতার পতাকা এখনো লালন করে বুকের নিভৃতে এই সত্য উপলব্ধি হয় পহেলা বৈশাখে। বাঙালীর প্রাণের এই উৎসব পহেলা বৈশাখই মনে করিয়ে দেয় আমাদের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার কথা।

বাঙালি জাতির শাশ্বত ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ পয়লা বৈশাখ
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বাঙালি জাতির শাশ্বত ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ পহেলা বৈশাখ। রাষ্ট্রপতি বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় জীবনে পরম আনন্দের দিন। আনন্দঘন এ দিনে তিনি দেশে ও দেশের বাইরে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে বাংলা নবর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এ দিনে চির নতুনের বার্তা নিয়ে আমাদের জীবনে বেজে উঠে বৈশাখের আগমনি গান। দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে মহানন্দে। পহেলা বৈশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার স্বরূপ।
তিনি বলেন, বৈশাখ শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মবিকাশ ও বেড়ে ওঠার প্রেরণা। বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় চিড় ধরাতে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি সামরিক সরকার বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনসহ সকল গণমুখী সংস্কৃতির অনুশীলন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত ভেদাভেদ ভুলে নববর্ষ উদ্যাপনে এক কাতারে শামিল হন।

ধর্মে-ধর্মে বিভেদ থাকবে না, এমন দেশ গড়তে হবে
সবাইকে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে ধর্মীয় বিভেদমুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত হয়ে আসুন, বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলি। যেখানে বৈষম্য থাকবে না, মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, থাকবে না ধর্মে-ধর্মে কোনো বিভেদ। পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আসুন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি। ১৪২৯ বঙ্গাব্দ উপলক্ষে বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন সরকার প্রধান। বাঙালির মুখের ভাষা,সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে উপজীব্য করেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
বাঙালির সম্প্রীতির দিন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন তার দেয়া বাণীতে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে সারা বছরের দুঃখ-জরা, মলিনতা ও ব্যর্থতাকে ভুলে সবাইকে নব-আনন্দে জেগে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির সম্প্রীতির দিন, বাঙালির মহামিলনের দিন। এদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জাতি জেগে ওঠে নবপ্রাণে, নব-অঙ্গীকারে। সারা বছরের দুঃখ-জরা, মলিনতা ও ব্যর্থতাকে ভুলে সবাইকে আজ নব-আনন্দে জেগে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পহেলা বৈশাখ নতুন ভাবনা, নতুন এক মাত্রা নিয়ে আসে আমাদের মাঝে। আমরা সৌভাগ্যবান যে ২০২০-২০২১ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী অর্থাৎ মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যুগপৎভাবে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করেছি। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এ বছর আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সময়ের প্রয়োজনে উৎসবের নগরায়ন ঘটেছে
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি বলেছেন, যুগের ও সময়ের প্রয়োজনে বাংলা নববর্ষ উৎসবের নগরায়ন ঘটেছে। তিনি বলেন, আগে নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা গ্রামে-গঞ্জে সীমাবদ্ধ ছিল যা এখন শহর, নগর, বন্দরে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরেই এখন বাংলা নববর্ষ উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। একইভাবে গ্রামীণ পিঠা উৎসবও শহুরে উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে, এ উৎসব যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব
আনুষ্ঠানিকতার সাথে নববর্ষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ ও লালন করা জরুরি। প্রতিমন্ত্রী বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এর কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে জাদুঘর আয়োজিত ‘বাংলা নববর্ষের নগরায়ন’ শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।তিনি বলেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এটি ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এ অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছে প্রতিটি বাঙালির কাছে শেকড়ের মিলনমেলায়।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির মহাঐক্যের দিন
বাংলা নববর্ষ ১৪২৯-কে স্বাগত জানিয়ে বাণী দিয়েছেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের। বুধবার (১৩ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে তিনি এ উপলক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত বাংলা ভাষাভাষীদের প্রতি শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও শুভ কামনা জানিয়েছেন। নববর্ষ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বঙ্গাব্দের প্রথম দিন বা বাংলা নববর্ষ। তাই, পহেলা বৈশাখ বাঙালির মহাঐক্যের দিন। ধর্ম, বর্ণ, জাত বা গোত্রের সিমারেখা ভেঙে পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজন আমাদের এক পথে চলতে সাহসী করে। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সুন্দর ও কল্যাণের জয়গানে শুভ পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে আমরা প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘পুরনো, জরাজীর্ণ, অশুভকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে চলতে পহেলা বৈশাখ আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। ব্যর্থতার গ্লানি মুছে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উজ্জ্বল আলোর রথে চলতে শেখায় পহেলা বৈশাখ।’
এছাড়াও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার (১৩ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নববর্ষের প্রথম প্রভাতে আমাদের অগণিত সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
‘বাংলা নববর্ষ ১৪২৯’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। আজ সরকারি ছুটির দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ছায়ানট রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। এদিন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে দেশের সকল জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে বৈশাখী র্যালি আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে নববর্ষ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। সকল সরকারি-বেসরকারি টিভি, বাংলাদেশ বেতার, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং বাংলা নববর্ষের ওপর বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি চ্যানেলসমূহ রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে।
ইউডি/অনিক

