শিশুর মানসিক বিকাশে চাই সুষ্ঠু পারিবারিক পরিবেশ
নজরুল ইসলাম সেজান । বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
মা-বাবা সন্তানাদি নিয়ে গঠিত হয় একটি পরিবার। প্রতিটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী পরিবার দেশ ও সমাজ গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সুখী সমৃদ্ধশালী পরিবার গঠনে বিশাল ভূমিকা পালন করে পরিবারের মা-বাবা। পরিবারের প্রতিটি শিশুই তার আপন পরিবার অর্থাৎ মা-বাবার নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করে থাকে। পরিবারের মা-বাবার সঠিক আচার-আচরণের উপর নির্ভর করে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন। শিশুর সুস্থ মস্তিষ্ক ও বেড়ে ওঠাও তার ভবিষ্যৎ জীবন সবটাই নির্ভর করে পরিবারের উপর। তাই সাংসারিক জীবনে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে মা-বাবাকে শিশুর প্রতি হতে হবে নমনীয়।
যে সংসার জীবনে মা-বাবার মধ্যে সবসময় ঝগড়া, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অশালীন ভাষা বিনিময় হয় শিশুর সামনে তা দেখে দেখে শিশুরা শেখে। শিশুরা কথা বলতে না পারলেও তাদের মনের মধ্যে এর প্রভাব বিস্তার করে। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে তার দৈহিক গঠন ও মন-মানসিকতারও একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তখন সে তার পরিবারের সমস্ত কার্যাবলি আস্তে আস্তে রপ্ত করতে থাকে। আর মন-মানসিকতার দিক দিয়ে সে বদমেজাজি ও খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠে। অঙ্কুুরেই ধ্বংস হয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ জীবন। শিশুর সামনে মা-বাবার অখেয়ালিপনা ঝগড়ার কারণে নষ্ট হয়ে যায় শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবন। তাই মা-বাবাকে শিশুর সামনে খারাপ আচরণ করা থেকে নীরব থাকতে হবে।
অনেকসময় বাবা-মায়েরা মনে করেন, তাদের ঝগড়াঝাটিতে অবুঝ শিশুদের মনে কোনো রেখাপাত করে না ভাবেন, হয়তো বাচ্চারা কিছু বুঝেই ওঠেনি। আড়ালে ঝগড়াঝাটি হলে শিশুরা সেটার কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর ছয় মাস বয়স থেকেই পিতা-মাতার ঝগড়ার প্রভাব পড়া শুরু হয় শিশুমনে। দুই বছর বয়স থেকে শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের আচরণ খেয়াল রাখতে শুরু করে। বাড়িতে যখন তারা বাবা-মায়ের মধ্যে কোনো ধরনের সহিংস সম্পর্ক দেখে, তখন তাদের হৃদকম্পন বেড়ে যায়। এ থেকে তার মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং হরমোনজনিত সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে শিশুর। পাশাপাশি, এতে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
অনেক সময় বাবা-মায়েরা ঝগড়াঝাটির পরে একে অপরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। দুজন দুজনকে উপেক্ষা-অবহেলা করতে থাকে। তখনো কিন্তু শিশুর আবেগ অনুভূতি, আচরণগত এবং সামাজিক মেলামেশার ওপর বড় রকমের প্রভাব পড়ে। আজকে যারা শিশু, আগামীতে তারাই কিন্তু শিশুর বাবা-মা। সুতরাং এর প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ওপরেও, যা সত্যি ভয়াবহ। শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টাতে পারিবারিক কলহ শিশুর ওপর বড় রকমের প্রভাব ফেলে। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য কী রকম হবে, পড়ালেখায় সে কেমন করবে, এমনকি ভবিষ্যতে শিশু যেসব সম্পর্কে জড়াবে, সেগুলো কেমন হতে পারে ইত্যাদি সবকিছুর ক্ষেত্রে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে পারিবারিক কলহ।
সন্তানের শৈশবকে সুন্দর রাখতে কোনো বিষয় ঝগড়ার দিকে মোড় নিচ্ছে দেখলেই শিশুর বাবা অথবা মাকে সেখানেই থেমে যেতে হবে। শিশুর সামনে ঝগড়াঝাটি একদম করা যাবে না। কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলে পরে স্বামী-স্ত্রী মিলে অমতের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এবং সমাধানে আসার জন্য পথ খুঁজতে পারেন।
ধৈর্য, সহমর্মিতায় তাকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া বাবা-মায়েরই কর্তব্য। বাবা-মায়ের ঝগড়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া ক্ষোভ সন্তানের ওপর দিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করা আমাদের দেশে খুবই একটা বাজে চর্চা। অনেক পরিবারে কলহ শুরুই হয় এসব দোষারোপ থেকে, যার প্রভাব সন্তানের ওপর অবধারিতভাবে পড়ে। সন্তানের কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ তার বাবা-মা। যখন একে অন্যকে দোষী বা খারাপ বানানোর চেষ্টায় ঝগড়া করে, তখন সেটা সন্তানের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের সন্তানদের শৈশব হোক সুন্দর, মধুময়। মুক্ত থাকুক তারা সকল কলুষতা থেকে। পরিশীলিত, বিনয়ী ও শান্তিপ্রিয় জাতি গড়তে এবং আগামী দিনে সুনাগরিক হয়ে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে আমাদের শিশুদের আমাদের নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

