টমাস আলভা এডিসন: উদ্ভাবনী শক্তিতে বিশ্বে অনন্য
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
টমাস আলভা এডিসনকে অনেকে বলেন আবিষ্কারের মেশিন। সহস্রাধিক ছোট বড় আবিষ্কারের পেটেন্ট নিয়েছিলেন তিনি নিজের নামে। একটি মানুষের মধ্যে এত উদ্ভাবনী শক্তি আর কখনও দেখা গেছে কিনা সন্দেহ। গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
১৮৮২ সালে সরকারের অনুরোধে প্রায় দুই বছর ধরে নিউইয়র্কের মাটির নিচে বৈদ্যুতিক লাইন পাতার কাজ করালেন এডিসন। প্রায় হাজার খানেক বাড়িতে ইলেক্ট্রিক ওয়ারিং হলো। তাছাড়া একটি বড় শহরে তো আর ব্যাটারী দিয়ে আলো জ্বালানো যায় না। তাই একটা ছোটখাটো পাওয়ার হাউজও তৈরি করেছিলেন।
টমাস আলভা এডিসন কে ছিলেন?
টমাস আলভা এডিসন ছিলেন আমেরিকান উদ্ভাবক এবং ব্যবসায়ী। তিনি গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতি (বাল্ব) সহ বহু যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যা বিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
টমাস এডিসনের জন্ম
টমাস আলভা এডিসন ১৮৪৭ সালে মিলান ওহাইওতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি পোর্ট হুরন, মিশিগানে বেড়ে উঠেন। কারণ তার পরিবার ১৮৫৪ সালে এই স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন স্যামুয়েল ওগডেন এডিসন জুনিয়রের সপ্তম এবং শেষ সন্তান। এবং ন্যান্সি ম্যাথিউজ এলিয়ট তার মা।
শৈশব ও আবিষ্কারের নেশা
তার বয়স যখন মাত্র সাত বছর তখনই তিনি একটি পরীক্ষাগার তৈরি করে ফেলেছিলেন টুকিটাকি জিনিস দিয়ে বিভিন্ন গাছের পাতা জলেতে মিশিয়ে সেই দ্রবণগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন রং বদলায় কিনা। দরিদ্র বাবা–মায়ের সন্তান টমাস আলভা এডিসন কিশোর বয়স থেকেই ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন আর বাজারে সবজি বিক্রি করতেন। কিন্তু যা আয় হতো তার বেশিরভাগই খরচ হতো রাসায়নিক দ্রব্য কেনার জন্য। সতেরো বছর বয়সে এডিসন সামান্য একটা চাকরি নিলেন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন টেলিগ্রাফ কোম্পানিতে। তখন টেলিগ্রাফ অফিস থেকে একই সময়ে একটির বেশি সঙ্কেত পাঠানো যেত না। এডিসনের মনে হলো বিদ্যুতের সাহায্যে একই সঙ্গে অনেকগুলো সঙ্কেত পাঠানো যেতে পারে। তখন তড়িৎ বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে সবেমাত্র। মাত্র ৩০ বছর আগে মাইকেল ফ্যারাডে বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পেরেছেন। কিন্তু ফ্যারাডের লেখা বইটি ইতিমধ্যে এডিসনের পড়া হয়ে গেছে। তাই কাউকে কিছু না বলে এডিসন নিজের বাড়িতে টেলিগ্রাফের সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন। ব্যাটারী তখন কিনতে পাওয়া যেত না বলে এডিসন নিজেই একটা ব্যাটারী তৈরি করে নিলেন।
টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার
কয়েক মাসের মধ্যেই টমাস আলভা এডিসন একটা টেলিগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করে ফেললেন। যার সাহায্যে এক সঙ্গে অনেক সঙ্কেত পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ টমাস আলভা এডিসন তার আবিষ্কারটি প্রকাশ করলেন না। কারণ, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই তিনি এই আবিষ্কারটি বিক্রি করে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার কথা ভাবছিলেন৷ তখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় টেলিগ্রাফ কোম্পানি ছিলো ‘গোল্ড ইনডিকেটর টেলিগ্রাফ কোম্পানি। সেখানে গিয়ে প্রস্তাবটি রাখতে না রাখতেই পেলেন অপ্রত্যাশিত প্রতিদান। কোম্পানি এডিসনকে দিলো চল্লিশ হাজার ডলার। এই অর্থ নিয়ে এডিসন নিউইয়র্ক থেকে ৪০ মাইল দূরে মেনলো পার্ক নামক জায়গায় বিশাল এক কারখানা খুলে ফেললেন। সেই কারখানার শ্রমিক ছিল একশ’রও বেশি। তৈরি হতো টেলিগ্রাম যন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ৷
ফনোগ্রাফ আবিষ্কার
এভাবে টমাস আলভা এডিসন বিরাট শিল্পপতি হয়ে উঠতে পারতেন। কিন্তু আবিষ্কারের নেশা তার পিছু ছাড়েনি। কয়েক বছর বাদে তিনি একটা জনসমাবেশ ডেকে ফেললেন। স্টেজের ওপর দাঁড় করানো ছিল একটা হাতাওয়ালা টিনের সিলিন্ডার। তার ওপর একটা সরু পিন এবং তার পিনের সঙ্গে আটকানো একটা ধাতব চোঙ। হঠাৎ করে তিনি হাতলটাকে ঘোরাতে শুরু করলেন আর গান ধরলেন, ‘মেরি হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব’। গানটি শেষ করেই দুটি তার নতুন করে যোগ করলেন একটা ব্যাটারীর সঙ্গে। তারপর আবার ঘোরাতে শুরু করলেন সেই হাতলটা। চোঙের ভিতর থেকে ভেসে এলো সেই কন্ঠ, সেই সুর। দারুণ হাততালি পড়ল দর্শকদের কাছ থেকে। এমন ম্যাজিক কেউ আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু তিনি তাদের বার বার বলতে লাগলেন, এটা ম্যাজিক নয়, এটা বিজ্ঞান।
বিদ্যুৎ আবিষ্কার
পরবর্তীকালে ১৮৭৮ সালে খেয়াল চাপল মানুষকে বৈদ্যুতিক আলো দেখাতে হবে। বাজ পড়ার সময় চোখ ঝলসে দেয় যে সেতো বিদ্যুতেরই কাজ। এর কণামাত্র কি পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যাবে না? রাস্তায় তখন টিমটিম করতো গ্যাসের আলো। বাড়ির ভিতর মোম তেলের আলো।
তার মাথায় এলো এমন কোনো জিনিস খুঁজে বের করতে হবে, যার ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ গেলে গরম ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাতের কাছে যা পান তা দিয়েই তিনি ব্যাটারীর দু’প্রান্ত যোগ করে দেখতে লাগলেন। প্রথমে তামার তারে কাগজ জড়িয়ে দেখলেন কাগজটা গরম হয়ে উঠছে আর একটু পরে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তারপর নরম ধাতু নিয়ে পরীক্ষা করলেন। ধাতুগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কিন্তু একটু পরেই গলে গেল। তার মনে হলো, দহনে সাহায্য করছে না তো বাতাসের অক্সিজেন? তাই এবার একটা কাঁচের বাতাস যথাসম্ভব বের করে নিলেন। হ্যা, তার ধারণাই ঠিক। ধাতব ফিলামেন্টটি জ্বলল প্রায় দশ মিনিট ধরে। একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো বলে প্রচণ্ড উৎসাহিত হয়ে উঠলেন টমাস আলভা এডিসন।
টমাস আলভা এডিসন এর মৃত্যু
এডিসনের প্রতিভা ছিল বিস্ময়কর। যে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন তাতেই লাভ করেছেন সাফল্য। বিশ্ব বিজ্ঞাপনের ইতিহাসের বিস্ময় প্রতিভা মহান বিজ্ঞানী এডিসন ১৯৩১ খ্রিঃ ১৮ই অক্টোবর ওয়েস্ট অরেঞ্জে চুরাশি বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।
ইউডি/সুস্মিত

