ঢাকা কলেজ-নিউমার্কেট এলাকা রণক্ষেত্র: ছাত্র-ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ সংঘাতের নেপথ্যের যত কারন
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২৫
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ পুরো রাজধানীজুড়েই স্বাভাবিক কার্যক্রমের গতি পরিবর্তন করেছে। মঙ্গলবার দিনজুড়ে সংঘর্ষে সৃষ্ট যানজটে ভুগতে হয়েছে রাজধানীবাসীর। একদিকে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও নিজেদের সিদ্ধান্তকে আকড়ে ধরেছেন। ইতোমধ্যে ঢাকা কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হলেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান শিক্ষার্থীদের। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস
ঠুনকো এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা। গত সোমবার রাতের সেই সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী ও দুই ব্যবসায়ী আহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও। ওইমধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া নিউমার্কেট ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজ শিক্ষার্ক্ষীদের সংঘর্ষ মঙ্গলবার রূপ নেয় বৃহৎ আকারে। এদিন দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপে একজনের মৃত্যু ও সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের আহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) সংঘর্ষ বাধারও অনেক পরে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেলেও তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের উদ্বেগ ছড়িয়েছে। কেননা তাদের উপস্থিতিতেও সংঘর্ষের গতি পাল্টায়নি। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজ আগামী ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ছাত্রদের হল ছাড়ারও নির্দেশ দেয়া হয়, তবে ছাত্ররা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে এবং প্রায় ঘন্টাখানেক অধ্যক্ষের বাসভবন অবরুদ্ধ করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে ওই এলাকার দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। এধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া কখনোই কাম্য নয়। উভয়পক্ষকেই এক্ষেত্রে সহনশীলতার পরিচয় দেয়া উচিত।
ঠুনকো ঘটনা রূপ নেয় বৃহৎ সংঘর্ষে: একটি খাবারের দোকানের কর্মীদের সঙ্গে বাকবিতø বাধে ঢাকা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর। এর জের ধরে গত সোমবার গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও দোকানিদের সংঘর্ষ হয়। তাতে কয়েকজন আহতও হন। পুলিশ আসে, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। সংঘর্ষ ওই রাত আড়াইটা পর্যন্ত গড়ায়। সাহ্রির সময় ঘনিয়ে আসায় দুই পক্ষ যখন রণে ক্ষান্ত দেয়, তখন পুলিশও চলে যায়। কিন্তু রাতের এই সংঘর্ষ সেখানেই শেষ হয়নি। এর জেরে মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় জড়ো হন মানববন্ধনের জন্য। এ সময় নিউমার্কেটসহ আশপাশের কয়েকটি মার্কেটের দোকানিরা বেরিয়ে এলে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষে বন্ধ হয়ে যায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মিরপুর সড়ক। শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। যানজট ছড়িয়ে পুরো শহরে। নিত্য যানজটের এ শহরে যোগ হয় চরম ভোগান্তি। সংঘর্ষ শুরুর তিন ঘণ্টা পর পুলিশ এসে আবার কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। নিউ মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, নিউ মার্কেটের ৪ নম্বর গেইটের কাছে একটি খাবারের দোকান থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। ওই খাবারের দোকানের লোকজনের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বাকবিতণ্ডার পর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে এসে হামলা চালায়।

সংঘর্ষে এক ডেলিভারিম্যানের মৃত্যু: এদিকে, সংঘর্ষে আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নিহতের নাম নাহিদ হাসান (২৩)। তিনি একটি ডি লিংক নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারিম্যানের চাকরি করতেন বলে তার স্বজনরা জানান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আলাউদ্দিন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে যখন নাহিদের মৃত্যু ঘোষণা করেন, তখন হাসপাতালে উপস্থিত তার স্ত্রী ডালিয়া সুলতানা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আহতদের সুচিকিৎসার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: শিক্ষামন্ত্রী ড. দিপু মনি জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেনের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী । আহত ছাত্র মোশাররফকে দেখতে মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) রাত সাড়ে নয়টায় স্কয়ার হাসপাতালে যান শিক্ষামন্ত্রী। এসময় মোশাররফের সুচিকিৎসার আশ্বাস দেন তিনি। তিনি মোশাররফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ কী: ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, চতুর্থ বর্ষ আর মাস্টার্সের তিনজন শিক্ষার্থী রাতে খেতে যায়। দাম যা আসছে তার চেয়ে একটু কম দিতে চেয়েছিল তারা। এসময় ঝগড়ার এক পর্যায়ে দোকানে থাকা ধারালো ছুরি নিয়ে শিক্ষার্থীদের গুরুতর জখম করে দোকানিরা। এই খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা গিয়ে ভাংচুর চালায়। এরপর ব্যবসায়ী ও পুলিশ ধাওয়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে দেয়। সাখাওয়াত বলেন, দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের দিক থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। আর ছাত্রদের এই দিক থেকে বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। রাতে ৭ জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধসহ মোট ১৫ জন আহত হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পুলিশ ও ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর যে ‘হামলা’ চালিয়েছে, তার বিচার হতে হবে। মঙ্গলবার বিকেলে কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এসব কথা জানান। পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলে জানান তারা। শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের ওপর গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর বিচার হতে হবে। পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের ক্ষমা চাইতে হবে। তারা বলেন, আমরা নিউ মার্কেট থানার ওসির অপসারণ দাবি করছি। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তারা জানান, হল-ক্যাম্পাস বন্ধ ইস্যুতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন শিক্ষার্থীরা। কর্তৃপক্ষ হল বন্ধ থাকবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হল-ক্যাম্পাস বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, যেকোনো মূল্যে হল-ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রয়োজনে আমরা লাশ হয়ে বের হব। তবু হল ক্যাম্পাস ছাড়ব না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা চালানো হয়েছে, এ ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা অধ্যক্ষকে বলেছি সুন্দরভাবে সমাধান করতে। তিনি যদি তা না পারেন, তবে তার পদত্যাগ দাবি করছি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ কী: ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, খাবারের দোকানে গিয়ে বিল না দেয়া বা কম দেওয়ার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। এ নিয়ে টুকটাক ঝামেলাও হয়। কিন্তু সুরাহা হয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নয়, এসব যারা করেন, তারা প্রভাবশালী কোনো সংগঠনের আশীর্বাদপুষ্ট। দোকানিদের সঙ্গে বচসার মতো ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে একজোট হয়ে হামলার ঘটনা সাধারণ কয়েকজন শিক্ষার্থীর পক্ষে যে সম্ভব নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। সংঘর্ষে জড়িত শিক্ষার্থীদের থামাতে কেউ এগিয়ে আসেননি দুর্ভাগ্যজনকভাবে। নিউমার্কেট ও এর আশপাশের এলাকায় অন্তত ২০টি বিপণিবিতান (মার্কেট) আছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, এসব মার্কেটে আছেন লক্ষাধিক ব্যবসায়ী। দোকানমালিকদের পক্ষে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঈদের আগে এই জমজমাট ব্যবসার মৌসুমে এক দিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে ক্ষতি দাঁড়াতে পারে শতকোটি টাকা। এত গেল অর্থের হিসাব। এই অঙ্ক নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু এই সংঘর্ষের কারণে যে নাগরিক ভোগান্তি হলো, তার মূল্য নির্ধারণ হবে কীভাবে?

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ: শিক্ষার্থীরা বলছেন, পুলিশ ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে ছাত্রদের টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়েছে। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা খুবই ধৈর্য্যরে পরিচয় দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ করে বলেছেন পুলিশ সঠিক সময়ে না আসলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারতো।
নিরাপত্তা বাহিনী চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয় নিয়ে বলেন, ঢাকা কলেজ ও নিউ মার্কেটের যে ঘটনা, দুঃখের সাথে বলছি, এটা একটি অনাহুত ঘটনা। ছোটোখাট একটি ঘটনা নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি পর্যায়ে চলে এসেছে। আমরা দেখছি সহিংসতা হয়েছে, আমরা দেখছি ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ির ঘটনা হয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী চরম ধৈর্যের সঙ্গে এগুলো লক্ষ্য করছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা বুদ্ধির কাজ না: ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। ছাত্রদের সাথে পুলিশের মোকাবেলা করার সময় আমাদের বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এটা সাধারণ কোনো ম্যাস গ্যাদারিং না যে গুলি করে তাদের আমরা সরিয়ে দেব। ছাত্ররা কলেজের ১০ তলা ভবনগুলোতে উঠে বৃষ্টির মত ইট পাটকেল নিক্ষেপ করছে। তাদের প্রতিপক্ষ, অর্থাৎ শ্রমিকদের বুঝিয়ে আমরা মার্কেটে ঢোকানোর চেষ্টা করছি। আমাদের মূল বিষয় হল, একটা পক্ষকে যদি আমরা নিবৃত করতে পারি। এখন আশপাশের সমস্ত শ্রমিকরা নেমে পড়েছে। বিষয়টি এখান থেকে যত ইজি মনে হচ্ছে, ফিল্ডে কিন্তু ততই জটিল অবস্থা। পুলিশ কমিশনার বলেন, যেখানে যেখানে আমি খবর পাচ্ছি, পুলিশ পাঠাচ্ছি। সাধারণভাবে গুলি করে বা শক্তি প্রয়োগ করে এটা দমন করা বুদ্ধির কাজ না।

ছাত্র-ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ‘দুঃখজনক’: এ ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার বিকালে চাঁদপুর সার্টিক হাউসে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০ এপ্রিল থেকে ঈদের ছুটিতে বন্ধ হয়ে যাবে। ঢাকা কলেজে যেহেতু ক্লাসের পরিবেশ নেই তাই আমরা বলেছি, সেখানে আজ থেকেই ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যাবে। আমি শিক্ষার্থীদের বলল, একদিন আগেই তারা ঈদের ছুটিতে চলে যাক। এটা তো ঈদের ছুটি, আগামীকাল থেকে বন্ধ হওয়ার কথা ছিল, সেটা আজকে থেকে হবে তাদের জন্য। এখন সব হল বন্ধ হয়ে যাবে, আশা করি, সব ঠিক হয়ে যাবে। উত্তেজনা আর ছড়াবে না। ঈদের ছুটির পরে ৫ মে থেকে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো যথারীতি তাদের হোস্টেল খোলা থাকবে। ক্লাস হবে, সব হবে, বলেন মন্ত্রী। ছাত্র-ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ মন্তব্য করে দীপু মনি বলেন, প্রায়শই দেখি ঢাকা কলেজ ও এর আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মচারীদের সঙ্গে ছাত্রদের বাকবিতণ্ডা হয়। অনেক সময় তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এটা খুবই দুঃখজনক। আমাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার বিষয়গুলো আমরা দেখছি।
ইউডি/সুপ্ত

