ঈদ কেনাকাটায় প্রতারণা: ভোক্তার পকেট কাটার শেষ কোথায়?
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫
আসন্ন ঈদের কেনাকাটায় চলছে প্রতারণা, কারসাজি, অতি মুনাফা করে ভোক্তার পকেট কাটার উৎসব। অপরাধের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে আদায় করা হচ্ছে জরিমানা, করা হচ্ছে সতর্ক। কিন্তু তারপরও তাদের অপতৎপরতা থামছে না। জনস্বার্থে অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে প্রতারণা ও কারসাজির হিংস্র থাবা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
রোজা আর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে যেন প্রতারণার মাধম্যে ভোক্তার পকেট কাটার মহোৎসব চলছে। রোজাদারদের সেহরি, ইফতারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্যের মূল্য কয়েক দফায় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকায় কর্মরত পেশাজীবীরা পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে যাবেন বাস-লঞ্চ্যের ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঈদের দিন নতুন জামা-কাপড় পড়বেন প্রতিটি কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু দাম বৃদ্ধিই নয় নামীদামি মার্কেটের দোকান এবং ব্র্যান্ডেড দোকানে ন্যার্য্য মূল্যের নামে কাপড়ে প্রকৃত দাম উঠিয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দাম লিখে রাখা হয়েছে। এভাবেই ক্রেতাদের পটেক কাটা হচ্ছে। এ যেন প্রতারণার মহোৎসব চলছে। চলমান প্রতারণায় শেষ কিভাবে? সরকারের আরও কঠোর উদ্যোগ ও ভোক্তার সচেতনতা রুখতে পারে কেনাকাটা এই প্রতারণা।
ইউরোপ ও আমেরিকায় বড়দিন উপলক্ষে এবং আমাদের পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়াতে পূজার সময় মূল্য ছাড় দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে রোজা কিংবা ঈদে মূল্য না কমিয়ে ভিন্ন মাত্রায় প্রতারণরা করে অতি মুনাফা লাভে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। অপরাধের জন্য আদায় করা হচ্ছে জরিমানা, করা হচ্ছে সতর্ক। কিন্তু তারপরও তাদের অপতৎপরতা থামছে না। বিগত ২০ এপ্রিল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজধানীর কদমতলী থানার জুরাইন-পোস্তগোলা এলাকার আলম সুপার মার্কেটে আব্দুস সাত্তার সুজ নামের কারখানায় বাটা, অ্যাপেক্সসহ নামীদামি ব্র্যান্ডের লোগোর আদলে নকল লোগো দিয়ে স্যান্ডেল তৈরি করছে। অ্যাপেক্স হয়ে গেছে অ্যাডেক্স ও বাটা হয়েছে বালা। এছাড়া অ্যাপেক্সের লোগো হুবহু নকল করা হচ্ছে।
শুধু তাই নয় হোটেল, রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ইফতারি তৈরি ও বিক্রি, বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে সেমাই, ঘি তৈরি, বেশি দামে মাংস ও বাসের টিকিট বিক্রির মতো অনৈতিক কাজে বেপরোয়া ব্যবসায়ীরা। এমনকি বিশ্ববিখ্যাত জুতার কোম্পানি বাটা, দেশীয় অ্যাপেক্স জুতায় নতুন সিল মেরে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। একইভাবে খাদ্য, জামাকাপড়, প্রসাধনী থেকে শুরু করে গণপরিবহনে বাসভাড়ার ক্ষেত্রেও ভোক্তাদের ঠকাতে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা। এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশনের বাজার অভিযান পরিচালনা করছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন তার একটি লেখায় লিখেছেন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনায় পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি, নির্ধারিত তালিকার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, নকল পণ্য প্রস্তুত করা, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তিমূলক জরিমানা করছে। তাও প্রতারণা কমছে না। কায়দা পাল্টে নানা ভাবে চলছেই প্রতারণা।
প্রতারণা দমনে করণীয়
কেনাকাটায় প্রতারণা দমনে সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে রোজা ও ঈদ মৌসুমে বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে কয়েক গুণ। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রতারণা না করতে ব্যবসায়ী সংগঠনের স্বদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে অনলাইনে মূল্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে নামীদামী ব্রান্ডের দোকানগুলোকে। এছাড়া ভোক্তা নিজে যেন প্রতারিত না হয় তাকেও পণ্য কেনার সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোন ভাবে প্রতারিত হয়ে গেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হবে। আইন দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সব সময় সম্ভব না ও হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন অতি মুনাফালোভী, প্রতারক, মজুতকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা।
মূল্য নিয়ে প্রতারণা
বিভিন্ন দোকানে ইচ্ছেমতো স্টিকার দিয়ে দাম নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আবার কোনো ক্রয়ের রশিদ নেই, বিক্রির রশিদও দেওয়া হয় না। এর বাইরে অভিনব কায়দায় প্রতারণা দেখা যায় নিউমার্কেটের ইরো ইথিক ওয়ার নামে পাঞ্জাবির দোকানে। পাঞ্জাবির প্রকৃত দাম ১ হাজার ১৯০ টাকা। মূল্য ছাড়ের নামে সেই পাঞ্জাবির দাম লাগানো হয়েছে ২ হাজার ৪৯০ টাকা। এই মূল্যের ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্টিকারের নিচে আরেকটি স্টিকার লাগানো রয়েছে। সেখানে মূল্য লেখা রয়েছে ১ হাজার ৭৯০ টাকা এবং এর নিচে আরও একটি স্টিকার রয়েছে। সেখানে মূল্য লেখা রয়েছে ১ হাজার ১৯০ টাকা। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে দেখা যায় সতেরশ টাকার শাড়ি ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গণপরিবহনেও প্রতারণা
শুধু খাবার বা জামা-কাপড়ে অতি মুনাফা ও প্রতারণা নয়, ঈদকে সামনে রেখে গণপরিবহনে যাতায়াতের বাসগুলোও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করতে দ্বিধাবোধ করছে না। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর কল্যাণপুর ও গাবতলীতে এবং দেশব্যাপী বিভিন্ন বাস কোম্পানির কাউন্টারে অভিযান পরিচালনা করে অনিয়মের জন্য সর্তকতা ও জরিমানা করেছেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনায় পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি, নির্ধারিত তালিকার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, নকল পণ্য প্রস্তুত করা, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তিমূলক জরিমানা করছে।
অনলাইনে আছে অভিনব প্রতারণা
অনলাইনে পণ্য সরবরাহ এবং মূল্য পরিশোধের যে ভয়াবহ প্রতারণা আমরা দেখেছি। মূল্য পরিশোধ করার পরও দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও পণ্য আসেনি কিংবা যে পণ্য দেওয়ার কথা তা না দিয়ে নিম্নমানের অন্য কিছু পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও কম নয়। আবার কোনো কিছু না দিয়েই টাকা আত্মসাৎ করে উধাও হয়ে গেছে। এসব হায় হায় ই-কমার্স কোম্পানির কিছু কিছু আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা চিহ্নিত করতে পারলেও ভুক্তভোগী মানুষের দুর্ভোগ কমেনি।
অসাধুরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে
অসাধু ব্যবসায়ীদের ভিত এতই শক্তিশালী যে তারা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এরকম জলজ্যান্ত মানুষ মেরে কোটিপতি হওয়ার লোকের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ইতিপূর্বে একই কায়দায় গুড়াদুধে ময়দা মিশ্রিত করার হোতাসহ চিনি, সয়াবিন, চাল কেলেঙ্কারি হোতাদের কোনো শাস্তি হয়নি। তারা পর্দার আড়ালে আবার রেহাই পেয়ে যায়। আর সাধারণ ভোক্তা হিসেবে জনগণ অসচেতন ও অসংগঠিত, ভোক্তার অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা, ভোক্তা সংগঠনগুলোকে সরকারি অবজ্ঞার কারণে প্রকারান্তরে বাংলাদেশকে ভেজাল, নিম্নমানের খাদ্যের বাজার ও পরীক্ষাগারে পরিণত করেছেন। ফলে মানুষ যা আয় করছে তার সিংহভাগই ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে চলে যাচ্ছে।
আইন থাকলেও বঞ্চিত ভোক্তারা
আইন থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন না হওয়ায় অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভোক্তা সাধারণ, যা বাস্তবিকভাবে প্রমাণিত। শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের পাশাপাশি এটি যথার্থ জোরদার করতে হবে। কেননা আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আবার এ আইন মান্য করাও প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, আইন প্রণয়নের ফলে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ভোক্তা তথা জনগণ এর সুফল পাচ্ছে, যদিও তা আশানুরূপ নয়। উন্নত দেশগুলোয় ভোক্তা অধিকারকে নাগরিকদের সাধারণ অধিকার হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এর মাধ্যমে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব।

ইসলামী নিয়মের পরিপন্থী
রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তারপরও রমজানকে কেন্দ্র করে অনেক মুসলিম দেশে পণ্যের দাম কমিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে রমজান এলেই খাদ্য-পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর আবির্ভাবও ঘটে। আবার অনেকে মনে করেন, রমজানে একমাস ব্যবসা করব ১১ মাস বসে থাকব। যার কারণে মহামান্য রাষ্ট্রপতিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অসাধু ব্যবসায়ীদের এসব কারসাজিকে আল্লাহর গজব বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ইসলাম পণ্য মজুত ও অতি মুনাফাকে সমর্থন করেনি। কিন্তু ধর্মীয় এসব বাণী সত্ত্বেও কে শুনে কার কথা। রমজানে রোজা রেখেও অনেক ব্যবসায়ী মূল্য কারসাজি, মজুতদারি, কৃত্রিম পণ্য সরবরাহ সংকট তৈরিতে বিরত থাকছে না। বাজারমূল্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রতিটি পণ্যের ক্রয় এবং বিক্রয় মূল্যের চার্ট ঝুলিয়ে রাখার জন্য ভোক্তা সংরক্ষণ আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা অনেকেই মানছেন না।
ব্যবসা শুধুমাত্র একটি অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার নয়, এটি উত্তম সেবাও বটে। যার মাধ্যমে একজন ব্যবসায়ী ভোক্তাকে খাদ্য-পণ্য ও সেবা সার্ভিস দিয়ে সেবাও করছেন। পণ্যের মূল্য ঘষামাজা করে অতি মুনাফা আদায়ে সচেষ্ট হওয়াকে ব্যবসা বলা যায় না। এটা প্রতারণা আর এই প্রতারণা ফৌজদারি অপরাধও বটে। তবে আইন দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সব সময় সম্ভব না ও হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন অতি মুনাফালোভী, প্রতারক, মজুতকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা। তাহলেই ব্যবসা-বাণিজ্যে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে।
ইউডি/অনিক

