ঈদযাত্রায় যাত্রী সাধারণের সচেতনতা অপরিহার্য
নজরুল ইসলাম সেজান । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ১৯:১০
আসছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে নেয়ার এই অভিযাত্রায় লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়বে। আসবেও অনেকে। কর্মব্যস্ততার কারণে শহরে থাকা মানুষগুলো যেন অপেক্ষায় থাকে এই খুশির দিনটির জন্য। তবে এবারের ঈদে অন্য সময়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি মানুষ বাড়ি ফিরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেননা করোনার কারণে গত দুটি ঈদে যারা বাড়ি যেতে পারেননি, তারা এবার শেকড়ের টানে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগিতে গ্রামে ফিরবেন।
এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে জারি করেছে সতর্কতা, আইনি পদক্ষেপ আর অব্যাহত রেখেছে অবকাঠামোগত উন্নয়নে কর্মসূচি। এসব পদক্ষেপ শুধু এ বছরই নয়, প্রতি বছর ঈদপূর্ব রুটিন দায়িত্ব হিসেবেই আমরা পরিলক্ষ করে আসছি। ইতোমধ্যে পুলিশ বিভাগ থেকে ঈদ যাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত সব যানবাহন কর্তৃপক্ষ, যাত্রীসাধারণ, চালক এবং সহযোগী সংস্থার দায়িত্ব পালনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ঈদপূর্ব যাত্রায় সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে চলাচল নির্বিঘœ থাকে না। বিশেষ করে সড়কপথে যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
সড়ক পথের যাত্রীরা অগ্রিম টিকেট কেনার জন্য বাসস্ট্যান্ডে কাউন্টারে গিয়ে নির্ধারিত মূল্যে টিকেট পাচ্ছেন না, ট্রেনে ২৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অগ্রিম টিকেট ক্রয়ের জন্য সেহরির পর অপেক্ষায় থেকেও সার্ভার জটিলতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টিকেট পাচ্ছেন না। অভিযোগ রয়েছে কালোবাজারে টিকেট কেনা বেচার। অতিরিক্ত বগি লাগিয়েও আসন না পাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে, ইঞ্জিনে, আর দুই বগির সংযোগস্থলে চেপে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। অথচ তারা টিকেট নিয়ে সিটে বসেই ফিরতে চান বাড়ি।
ট্রেনের ন্যায় নদীপথেও রয়েছে মাত্র একটি এক্সিট পয়েন্ট সদর ঘাট নৌ টারমিনাল। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, বরগুনা তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আবহমান কালের যাতায়াত মাধ্যম লঞ্চ স্টিমার। ট্রেনের মতোই ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চভর্তি মানুষ গাদাগাদি করে চলছে বাড়ির পথে। যাত্রীর চাপে পথে নামে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ আর প্রশিক্ষণ বিহীন সারেং খালাসী। নৌপথের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে রাতে চলাচল করতে গিয়ে মুখোমুখি ধাক্কায় দুর্ঘটনায় সলিল সমাধির খবরে যেন আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।
সড়ক পথে যেখানে স্টপেজ নেই সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করার কারণেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের চারটি প্রধান মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে এবং ট্রাফিক সিস্টেম স্বাভাবিক করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশও দায়িত্ব পালনে হিমশিম খায়। সেক্ষেত্রে ঈদযাত্রায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা তাদের পক্ষে কতটা সম্ভব সেটাও বিবেচ্য। এটা স্বীকার্য যে ঈদ উপলক্ষে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ চলাচল করে।
২০১৭ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ষাট লাখ মানুষ ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকা ছেড়ে ছিল। এ কারণে ঈদের আগে কিছু ট্রেনের বগি বাড়িয়ে, তাৎক্ষণিকভাবে সড়ক উন্নয়নে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হলেও অনেক সময় তা কার্যকর হয়ে উঠে না, বরং দুর্ভোগ বাড়ে। বহু পরিবারের ঈদের আনন্দ বিষাদেও পরিণত হয়। আমরা শুধু উত্তর অঞ্চলের যাত্রী সাধারণের ঈদযাত্রা সহজ ও আনন্দময় দেখতে চাই না, চাই সারাদেশের মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে নির্বিঘেœ বাড়ি ফিরছে। এজন্য শুধু সরকারি নির্দেশনা নয় বরং সরকারের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনাগত ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সহযোগিতা এবং যাত্রী সাধারণের সচেতনতা অপরিহার্য।
প্রতি ঈদেই পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন দুর্ঘটনার খবর প্রায়ই দেখা যায়। ঈদে দুর্ঘটনার প্রবণতা খুবই বেড়ে যায়। জনবহুল এ দেশে ঈদে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে যত মানুষ যানবাহনে গমন করে, সে পরিমাণে পরিবহন, রাস্তা-ঘাট, এমনকি দক্ষ চালকের এক বিশাল স্বল্পতা রয়েছে। অদক্ষ চালক, শ্রমিকের দক্ষতার অভাব সব মিলিয়ে যেন এক নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই রাস্তাঘাটে প্রশস্থতা বৃদ্ধি, পরিবহনে কর্মরত সকলের দক্ষতা অনুযায়ী প্রবেশ, পরিবহন আইনের প্রয়োগ, নির্দিষ্ট স্থানে ট্রাফিক কন্ট্রোলসহ লঞ্চ ও ট্রেনের ভ্রমণ নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে নিরাপদে বাড়ি ফেরা অনেকটা নিশ্চিত হবে। সর্বোপরি সকলের সচেতনতা এ বিষয়ে জরুরি।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সিফাত

