ভিডিও গেম আসক্তি মানসিক অসুখ

ভিডিও গেম আসক্তি মানসিক অসুখ

আতোয়ারা আসমাউল তমা । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ১৮:০৯

আধুনিক বিশ্বে উন্মাদনার অপর এক নাম ভিডিও গেমস। বহু বছর ধরে ভিডিও গেম হয়েছে আরও বেশি জনপ্রিয়, উপভোগ্য এবং চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু ভিডিও গেম বা কম্পিউটার গেমের নেশা যে একটি মানসিক রোগ- এটি এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারই স্বীকৃতি। তারা বলছে, এটা এমন এক ধরনের আচরণ যা জীবনের আর সব কিছুর আকর্ষণ থেকে একজনকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস বা আইসিডি হলো এমন একটি গাইড যেখানে বিভিন্ন রোগের কোড, লক্ষণ এবং উপসর্গ সম্পর্কিত বিস্তারিত থাকে। চিকিৎসক এবং গবেষকরা এটির সঙ্গে মিলিয়ে রোগ নির্ণয়ের করার চেষ্টা করেন।

গেমিং আসক্তিকে কখন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হবে, তার বিবরণ হিসেবে এ গাইডলাইনে বলা হয়েছে যে, ১২ মাস ধরে অস্বাভাবিক গেমিং আসক্তি বা আচরণ দেখা গেলে তা নির্ণয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে কারও ক্ষেত্রে যদি অস্বাভাবিক আচরণের মাত্রা অনেক বেশি হয়, তখন ১২ মাস নয়, তার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যে সব লক্ষণের কথা এতে উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে গেমিং নিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা (বিশেষ করে কত ঘন ঘন, কতটা তীব্র এবং কত দীর্ঘ সময় ধরে গেমিং করছে সে বিষয়ে), গেমিংকেই সবচেয়ে প্রাধান্য দেওয়া এবং নেতিবাচক প্রভাব সত্তে¡ও গেমিং অব্যাহত রাখা বা আরও বেশি গেমিং করা। অবশ্য এর আগেই পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে গেমিং আসক্তিকে প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ কিছু দেশে তো ইতোমধ্যে এর চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট এডিকশন ক্লিনিক পর্যন্ত রয়েছে! মার্কিন শিশু-কিশোরদের অটিজম, মনোযোগ হ্রাস, হতাশা ও তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে ভিডিও গেম আসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

গেমসের আসক্তির কারণে মারমুখী ক্ষ্যাপাটে আচরণ, বাবা-মার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে পড়া, ইন্টারনেট না থাকলে অথবা মোবাইল বা কম্পিউটারের চার্জ ফুরিয়ে গেলে অস্থির-আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা তো অহরহই ঘটছে। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, নেশা মানেই শুধু মদ বা মাদক নয়।
নেশা বা মাদকাসক্তি কেবল মদ-গাঁজা, আফিম-হেরোইন ও বিড়ি-সিগারেটের সেকেলে পরিসরে আবদ্ধ নেই। কালের পরিক্রমায় প্রযুক্তির কল্যাণে এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার বদান্যতায় নেশার পতিত অঙ্গনেও লেগেছে ডিজিটালের ছোঁয়া! ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ধ্বংসাত্মক ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষ এমন নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।

ভিডিও গেমসের মধ্যে শিশু, কিশোর এমনকি যুবকরাও এতই সময় ব্যয় করছে যে, তাদের পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া সবই শিকেয় উঠেছে। বর্তমানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় ধস নেমেছে এসব ভিডিও গেমের প্রতি আসক্তির কারণে। শিক্ষক অভিভাবকরা এ নিয়ে এখন চিন্তিত। বাস্তবতা হলো, খুব কম মানুষই বর্তমানে গেমিং রোগের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। ভিডিও গেমসের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে রং-বেরঙের দৃশ্যপট পরিবর্তন, সারাক্ষণ অবিশ্বাস্য গতিতে ছোটাছুটি, জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা- এসব গেমারের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেখা যাচ্ছে, কোন কিছুতেই তাদের স্থিরতা থাকছে না। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা তাড়াহুড়ো করছে। অযথা সন্দেহ-অবিশ্বাস তাদের মধ্যে জেঁকে বসছে।

শহরের ইট, পাথর আর কংক্রিটের আড়ালে আটকা পড়ছে শিশুদের বর্ণিল শৈশব। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলার কিছুটা সুযোগ পেলেও শহরের শিশুদের সে সুযোগ কম। আর তাই অভিভাবকরা বিনোদনের নামে যা তুলে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের হাতে, তার ক্ষতির পরিমাণটা তাদের ধারণারও বাহিরে। ইন্টারনেট বা গেম খেলা কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। কিন্তু এর ক্ষতিকর, অযৌক্তিক, অপরিমিত ব্যবহার চিন্তা এবং আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। এই ইন্টারনেটের ব্যবহার বা গেম খেলার বিষয়টি যখন তার চিন্তা আর আচরণের ওপর খারাপ ধরনের প্রভাব ফেলবে, সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দেবে বা দৈনন্দিন জীবনযাপনের মান খারাপ করে দেবে তখন তা আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। অল্পতেই তারা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছে। বাস্তব জীবনেও নিজের পরাজয়কে তারা মেনে নিতে পারছে না। আর এসব প্রবণতা শিশুদের ক্রমেই নেতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক- শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউডি/সিফাত

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading