হুমকিতে জীবন: প্লাস্টিক ব্যবহারের ভয়াবহতা
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ৭ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
প্লাস্টিকের ব্যবহার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার যেন অপরিহার্য অংশগুলোর একটি। বিশ্লেষকরা এই প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করলেও টনক নড়ছে না কারও। এতদিন সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে প্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা মানুষের কাছে বিপদের উদাহরণ হলেও অতিসম্প্রতি খোদ মানুষের রক্তেও প্লাস্টিকের কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) পাওয়া গেছে। বিজ্ঞাণীদের এই গবেষণা প্লাস্টিকের ব্যবহারের ভয়াবহতা বহুগুণেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে। এভারেস্টের চূড়া থেকে শুরু করে গভীর সগারের অন্ধকার তলদেশ, কোথা নেই প্লাস্টিক! ভাবুন তো একবার, আপনার রক্তে ছুটে বেড়াচ্ছে অতি সুক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা। রক্তে ভেসে ভেসে সেগুলি আপনার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৌঁছে যাচ্ছে। মানবদেহের জন্য এটা কতটা ক্ষতিকর তা এখনও জানা যায়নি। তবে, গবেষণাগারে পরীক্ষা দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানব কোষের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম। দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেওয়ার ফলে এমনিতেই কোটি কোটি বস্তুকণা আমাদের দেহে প্রবেশ করছে, যার মধ্যে প্লাস্টিক কণাও রয়েছে। যা প্রতি বছর লাখো মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্লাস্টিকের ব্যবহারে মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ আজ হুমকীর মুখে। মানুষের প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিবছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উঞ্চায়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এত এত ক্ষতি সামনে রেখেও কোনো অংশেই কমছে না প্লাস্টিকের ব্যবহার। বরং দিনকে দিন এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে সয়লাব হচ্ছে চারিদিক।
মানুষের রক্তেও প্লাস্টিকের উপস্থিতি: সম্প্রতি নেদারল্যান্ডের একটি গবেষণায় ২২ জন সুস্থ স্বাভাবিক স্বেচ্ছাসেবক থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে তাদের ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের বলছেন, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক এভাবে যেকোনও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। দৃশ্যমান প্লাস্টিক গুলির ক্ষুদ্রতম কণা মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে পৃথিবীর গভীরতম সাগরের তলদেশ থেকে উচ্চতম পর্বতের চূড়া অবধি সব জায়গায় এমনকি বাতাসেও ভেসে বেড়ানো, যার প্রমাণ মাটিতে মিশে থাকা এবং খাদ্যশৃংখলে এর অস্তিত্ব খাদ্যশৃংখলে এর অস্তিত্ব।
অ্যামস্টারড্যামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোটক্সিকোলজিস্ট ডিক ভেথাকের জানান, তাদের ওই গবেষণায় এই প্রথম মানুষের রক্তে পাওয়া গিয়েছে পলিমার পার্টিকলস। এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন ২২ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক, যাঁদের মধ্যে ১৭ জনের রক্তপরীক্ষাতেই পাওয়া গিয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এদের মধ্যে কারও শরীরে পাওয়া গিয়েছে পেট প্লাস্টিক যা দিয়ে তৈরি হয় জলের বোতল, কারও শরীরে মিলেছে পলিস্টেরাইন, যা থাকে খাবারের কন্টেনারে। আবার কিছু মানুষের রক্তে মিলেছে পলিইথাইলিন, যা দিয়ে তৈরি হয় প্লাস্টিকের ছোট ক্যারি ব্যাগ। এক-এক জনের শরীরের রক্তে আবার দু’-তিন রকমের প্লাস্টিকও মিলেছে। কী ভাবে তা রক্তে প্রবেশ করছে, এখনও গবেষণাসাপেক্ষ।

‘গবেষণার পরিধি আরও অনেক বাড়ানো দরকার’: ব্রিটেনের ন্যাশনাল ওসানোগ্রফিক স্টাডিজের অধ্যাপিকা অ্যালিস হরটনের মতে, এই গবেষণা দ্বিধাদ্বন্দ্বহীনভাবে প্রমাণ করে মানুষের দেহে প্লাস্টিক রয়েছে। পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেহকেও দখল করে নিচ্ছে এই প্লাস্টিক। পর্টসমথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ফে কুসেইরো জানান, এই গবেষণার পরিধি আরও অনেক বাড়ানো দরকার আরও ভালোভাবে মানুষের রক্তে প্লাস্টিকের উপস্থিতি সংক্রান্ত পরিস্থিতি বোঝার জন্য। তবে যেহেতু রক্ত দ্বারা আমাদের শরীরের সমস্ত অংশ জুড়ে আছে সেজন্য আদের দেহের যেকোনও অংশেই প্লাস্টিক থাকতে পারে।
মানবদেহে প্লাস্টিক প্রবেশ করে কীভাবে?: পরিবেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে প্লাস্টিকের কণা। কিন্তু এত দিন মনে করা হত, মানুষের রক্তে এই প্লাস্টিক মিশতে পারে না। কারণ প্লাস্টিকের কণা পেটে গেলেও, তা শরীর ঠিক টের পায় এবং সেটি রেচনক্রিয়ার মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু সেই ধারণা যে সম্পূর্ণ ভুল, তা টের পাওয়া গেল সাম্প্রতিক এই গবেষণায়। এর ভয়াবহ ফল মানুষের স্বাস্থ্যে পড়তে চলেছে বলেও আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। কিভাবে প্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে, প্রশ্ন থেকে যায়। তালিকায় প্রথমেই রয়েছে পানির বোতল। প্লাস্টিকের পানির বোতল মারাত্মক বিপজ্জনক বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর পরেই রয়েছে শ্বাসের মাধ্যমে বাতাল থেকে। প্লাস্টিকে জড়িয়ে রাখা খাবার। ট্যাটু করানোর কালিতেও এই জাতীয় প্লাস্টিক থাকে। সেগুলি ত্বকের জালিকা ভেদ করে রক্তে মিশতে পারে। বিশেষ ধরনের টুথপেস্ট।
শরীরে প্লাস্টিক প্রবেশের ভয়াবহতা কী?: বিজ্ঞানীদের বলছেন, একবার রক্তে ঢুকে পড়ায় এই প্লাস্টিক ছড়াবে সব অঙ্গেই। সবচেয়ে ভয়ের হল এটি মস্তিষ্কেও পৌঁছে যাবে। এর ফল কী কী হতে পারে, তা এখনই বুঝতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা। তবে পরিস্থিতি যে রীতিমতো উদ্বেগজনক, তা মেনে নিচ্ছেন তারা।
শিশুস্বাস্থ্য হুমকির মুখে: প্লাস্টিক দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর জায়গায় রয়েছে শিশুরা। কারণ গবেষণায় স্পষ্ট হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বাচ্চাদের মলে প্রায় দশগুণ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে তাদের শরীরেও ব্যাপক হারে প্রবেশ ঘটছে এই বিষাক্ত বস্তুর। বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাস্টিকের ব্যবহার এখনই বন্ধ না করলে ২০৪০ সালে এই পৃথিবীতে প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়ে যাবে প্রায় দ্বিগুণ। তখন মনুষ্যশরীরে এই ‘প্লাস্টিক’রূপী ভাইরাসের দাপট কি রোখা যাবে?

২০৫০ সালের মধ্যে প্লাস্টিকে সয়লাব হবে সাগর: সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক প্রতিবছর সাগরে পতিত হওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীব্যাপী প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক বোতল সাগরে পতিত হয়, যা জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অধিকাংশ মাটির সঙ্গে মিশে যায় না এবং কিছু কিছু মিশলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার: বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। স্থায়িত্ব, কম খরচ এবং বিভিন্ন আকার ও এর সহজলভ্যতার কারণে প্লাস্টিক ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ভোক্তা সমাজ ও উৎপাদনকারীদের মানসিকতা এবং আচরণ এর জন্য দায়ী। একক উদ্দেশ্যে ব্যবহƒত প্লাস্টিক সামগ্রী যেমন পানির বোতল, স্ট্র, প্লাস্টিকের চামচ ইত্যাদি একবার ব্যবহার করার পর ফেলে দেওয়া হয় এবং এসব দ্রব্যের চূড়ান্তগন্তব্য হয় আমাদের নদী বা সমুদ্রে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে আরও বাড়বে যদি এর লাগাম টেনে ধরা না হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখের বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
ঢাকায় দিনে ১ কোটি ৪০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হচ্ছে: এখানে প্রতিবছর মাথাপিছু প্রায় পাঁচ কেজি প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহৃত করা হয় এবং জিডিপিতে এর পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ। ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হচ্ছে আর তা জলাধার, নদী ও মহাসাগরে গিয়ে জমা হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর ফেলছে মারাত্মক প্রভাব। শহরের পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থ-ডে নেটওয়ার্কে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিশ্বের সর্বাধিক ২০টি প্লাস্টিক দূষণকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ইন্দোনেশিয়া। দেশের বর্জ্যের প্রায় ৮ শতাংশ হলো প্লাস্টিক। এর চার ভাগের এক ভাগ গিয়ে পড়ে সাগরে ও নদীতে। এসব কারণে ব্যবহার-পরবর্তী প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে: প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতামূলক বার্তা দিতে হবে, প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কারের কর্মসূচি নিতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদের ধারক, তাতেই দিনের পর দিন আমরা যে ভাবে ছিদ্র তৈরি করে চলেছি, তা বিরাট গহ্বরে পরিণত হতে আর দেরি নেই। নিজেদের এখনও নিয়ন্ত্রণ না করলে সেই কালের গহ্বরেই হারিয়ে যাবে একটা গোটা সভ্যতা। আর একটা সভ্যতা-বধে সফল হবে কয়েক মাইক্রনের প্লাস্টিক।
প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে তৎপর হতে হবে: পরিবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো যেমন- মাটি, পানি, বায়ু প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক দ্বারা দূষিত হচ্ছে। এছাড়া প্লাস্টিক স্টিরিন নামক ক্ষতিকর পদার্থ নির্গত করে, যা মানবদেহে তৈরি করতে পারে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি। মোটকথা, প্লাস্টিক পদার্থটি কোনোভাবেই পরিবেশ ও মানবজীবনের জন্য উপকারী নয়। বরং এর ব্যবহারে পরিবেশ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাতে এর বড় ধরনের মাশুল দিতে হচ্ছে মানুষকে। তাই পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে প্লাস্টিক দ্রব্য ব্যবহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে সবাইকে তৎপর হতে হবে এবং ব্যবহƒত প্লাস্টিক পণ্য যত্রতত্র না ফেলে এগুলো নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। আমাদের সবার এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন যে, আমরা যত দ্রুত প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে, তত দ্রুত প্লাস্টিক-দূষিত পরিবেশ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারব।
ইউডি/সুপ্ত

