দেশে অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে করণীয়
আরাফাত রহমান । রবিবার, ৮ মে ২০২২ । আপডেট ১১:২০
শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতিজনিত অবস্থা বুঝাতেই অপুষ্টি শব্দটি সচরাচর ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এক বা একাধিক বিশেষ করে আমিষ উপাদানের স্বল্পতা অর্থাৎ সুষম খাদ্যের দীর্ঘ অভাবই অপুষ্টির অন্যতম কারণ। গত কয়েক দশকে খাদ্যশস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ, মাংস, দুধ ও তেল আহার যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। ফল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও তেল খাওয়া কমে যাওয়াসহ মোট খাদ্যগ্রহণও হ্রাস পেয়েছে যা গোটা সমাজ ও জাতির জন্য এক বড় সমস্যা। অপুষ্টিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধদাত্রী মায়েরা।
বাংলাদেশ সম্প্রতি খাদ্যে, প্রধানত ধান ও গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠলেও মা-বাবার ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে উপযুক্ত খাদ্য শিশুদের নাগালে পৌঁছায় না। অধিকন্তু, সুষম বৃদ্ধির জন্য কেবল ভাত প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগাতে পারে না। এজন্য দরকার মাছ, মাংস দুধ ও ডিমের মতো প্রোটিন এবং ভিটামিন ও খনিজ লবণসমৃদ্ধ ফলমূল ও শাকসবজি। শিশুদের খাদ্যাভাবের বহুদৃষ্ট প্রকাশ হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য ও শক্তিসমৃদ্ধ দানাশস্যের অভাবজনিত পুষ্টিহীনতা কোয়াশিওরকর ও অস্থিচর্মসার ম্যারাসমাস।
দেহের উচ্চতা ও ওজনভিত্তিক শ্রেণিকরণ পদ্ধতি অনুযায়ী স্বাভাবিক উচ্চতা ও ওজনসম্পন্ন শিশুদের অনুপাত কিছুটা বাড়লেও দুর্বল ও দেহের ব্যাহত বৃদ্ধি হার অপরিবর্তিত রয়েছে। লিঙ্গবৈষম্যগত বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে যে, একই বয়সের ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এবং শহরের শিশু অপেক্ষা গ্রামের শিশুরা অধিক অপুষ্ট। এক বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যুর হার এখন নিম্নমুখী হলেও পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুর ৫০-৬০ ভাগ মারা যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপুষ্টির কারণে।
বিশ্বে অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের অর্ধেকের বেশিই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের, যা সংখ্যায় ৫০ কোটির কাছাকাছি। সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সার্বিকভাবে বেড়েছে এবং তা এক দশক আগের পর্যায়ে ফিরে গেছে। ফলে আঞ্চলিক এই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ায় এই অঞ্চলে ক্ষুধা ও অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে আসা স্থবিরতা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপুষ্টি বা পুষ্টির অভাব এমন একটা খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাওয়ার ফলস্বরূপ ঘটে যেখানে পুষ্টিকর উপাদানগুলো যথেষ্ট নয় অথবা এত বেশি যে তার কারণে স্বাস্থ্যের সমস্যা ঘটে। সংশ্লিষ্ট পুষ্টিকর উপাদানগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে- ক্যালরি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন বা খনিজ পদার্থ। এটা অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্টভাবে পুষ্টির অভাবের প্রতি নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে পর্যাপ্ত ক্যালরি, প্রোটিন বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নেই তবে অধিক-পুষ্টিও এর অন্তর্ভুক্ত। যদি গর্ভাবস্থায় অথবা দুই বছর বয়স হওয়ার আগে পুষ্টির অভাব ঘটে, তাহলে এর ফলস্বরূপ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে স্থায়ী সমস্যা হতে পারে।
পুষ্টি উন্নত করার প্রচেষ্টা হল উন্নয়নগত সহায়তার সবচেয়ে কার্যকর রূপ। স্তন্যপান করালে তা শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও মৃত্যুর হার কমাতে পারে এবং এই অভ্যাস প্রচারের প্রচেষ্টার হার বৃদ্ধি করে। ছয় মাস ও দুই বছরের মধ্যে ছোট শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি খাবার দেওয়া হলে তা ফলাফলকে উন্নত করে। উন্নয়নশীল বিশ্বে গর্ভাবস্থায় এবং ছোট শিশুদের মধ্যে অনেকগুলি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের সম্পূরক প্রদান করারও ভাল প্রমাণ আছে। বেশির ভাগ সময় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত আরোগ্যকারী খাদ্যের সাহায্যে সেই ব্যক্তির বাড়ির ভেতরে তীব্র অপুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। যাদের তীব্র অপুষ্টি আছে এবং স্বাস্থ্যের অন্যান্য সমস্যার কারণে তা আরো জটিল হয়ে যায়, তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেওয়া উচিত। এর জন্য প্রায়ই রক্তে কম শর্করা, শরীরের তাপমাত্রা, জলশূন্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং ধীরে ধীরে খাওয়াতে হয়। সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির কারণে সাধারণত গতানুগতিক অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর পরামর্শ দেওয়া হয়। দীর্ঘকালীন পদক্ষেপগুলোর অন্তর্ভুক্ত হল- কৃষির অনুশীলনগুলোকে উন্নত করা, দারিদ্র হ্রাস করা এবং নারীদের ক্ষমতা প্রদান করা।
লেখক : কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

