ইউক্রেন নিয়ে মুখোমুখি আমেরিকা-রাশিয়া: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ৯ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গড়িয়েছে তৃতীয় মাসে। এই যুদ্ধ বন্ধে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ জাতিসংঘও। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ইউক্রেনের পক্ষে তিন মাস ধরে রাশিয়ার মতো দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যুদ্ধে ইউক্রেন একা নয়, আমেরিকাও কী এর সঙ্গে যুক্ত আছে? সাম্প্রতিক রুশ জেনারেল হত্যা ও রুশ যুদ্ধজাহাজডুবীর ঘটনা এই প্রশ্ন আরও জোড়ালো করেছে। তবে কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন? বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
রাশিয়া-ইউক্রেন আগ্রাসনে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমাদেশগুলো। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা একের পর এক বেড়েছে। ব্রিটেন ও আমেরিকা ইউক্রেনকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়েই যাচ্ছে। জার্মানিও তাদের অস্ত্র সহায়তা দিয়ে ইউক্রেনের পাশে রয়েছে। এসকল তথ্য প্রকাশ্যে প্রচার করা হলেও পর্দার আড়ালে কী অন্য কোনো তথ্য লুকিয়ে আছে? সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা ইউক্রেনের তীব্র প্রতিরোধের পেছনের রহস্য অনেকটাই উন্মোচন করছে বলে জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা। খবর আসছে ইউক্রেন একা নয় তাদের সঙ্গে এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছে আমেরিকাও। বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনে বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম এবং যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করছে এবং তাদের বাহিনীকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিয়েভকে উপগ্রহ, ইলেকট্রনিক নজরদারি অপারেশন এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য সরবরাহ করছে। যদিও দেশটি বারবার এই তথ্য অস্বীকার করেই আসছে।

ইউক্রেন নয়, রুশ যুদ্ধজাহাজ ‘মস্কোভা’ ধ্বংসের নেপথ্যে কে?: গত ১৪ এপ্রিল ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাগরে ডুবে যায় রাশিয়ার ফ্লাগশিপ যুদ্ধজাহাজ মস্কোভা মিসাইল ক্রুজার। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, আমেরিকার গোয়েন্দারা ইউক্রেনকে ওই যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী আমেরিকানদের কাছে ওডেসার দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগরে একটি জাহাজ যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার পরই ওই হামলার ঘটনা ঘটে। আমেরিকা এটিকে মস্কোভা হিসেবে চিহ্নিত করে সেটির অবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এরপরই ইউক্রেনীয়রা জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। পতন হয় কৃষ্ণসাগরে রুশ বহরের অহংকার হিসেবে পরিচিত ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ মস্কোভার।
রুশ জেনারেলদের হত্যার নেপথ্যেও ওয়াশিংটন!: এদিকে, ইউক্রেনে রুশ জেনারেলদের হত্যার নেপথ্যেও ওয়াশিংটনের হাত রয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছে। আমেরিকার সিনিয়র কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই রুশ জেনারেলদের হত্যার সুযোগ পেয়েছে ইউক্রেন। আমেরিকা ইউক্রেনকে রাশিয়ার সামরিক অবস্থান এবং অন্যান্য বিশদ বিবরণ সরবরাহ করেছে। এসব পর্যালোচনা করে সিনিয়র রাশিয়ান অফিসারদের শনাক্ত করতে সমর্থ হয় কিয়েভ। এরপর তারা এসব স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। তবে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ রুশ জেনারেলদের অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার কথা অস্বীকার করেছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, এটি সত্য যে ইউক্রেনীয়দের তাদের দেশকে রক্ষা করতে সহায়তা করার জন্য আমেরিকা কিয়েভের বাহিনীকে সামরিক বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ করে। কিরবি বলেন, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে সিনিয়র সামরিক নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করি নাই বা ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু করার সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করি নাই। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, ইউক্রেন কোনো রুশ নেতাকে টার্গেট করবে কি করবে না সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত । তিনি বলেন, ইউক্রেন এমন তথ্য একত্রিত করে যা আমরা এবং অন্যান্য অংশীদাররা বুদ্ধিমত্তার সাথে সরবরাহ করে যা তারা নিজেরাই যুদ্ধক্ষেত্রে সংগ্রহ করছে। এনএসসির মুখপাত্র অ্যাড্রিয়েন ওয়াটসন বলেছেন, ইউক্রেনীয়দের তাদের দেশ রক্ষায় সহায়তা করার জন্য আমেরিকা যুদ্ধক্ষেত্রের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। আমরা রাশিয়ান জেনারেলদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করি নাই।
আমেরিকা চায় দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হোক রাশিয়া: ইউক্রেনের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন কেবল বেড়েছে, এবং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়ানরা ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল যে তারা শুধুমাত্র ইউক্রেনকে টিকে থাকতে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু এখন ওয়াশিংটন বলছে, যুদ্ধে তাদের লক্ষ্য রাশিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন এপ্রিলের শেষের দিকে কিয়েভ সফরের পরে বলেন, আমরা দেখতে চাই যে রাশিয়া এমনভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে যে এটি ইউক্রেন আক্রমণ করার ক্ষেত্রে যে ধরনের কাজ করেছে তা করতে পারছে না। রাশিয়ার এক আইনজীবী দাবি করেছেন ইউক্রেনকে শুধু পাশে থেকেই সাহায্য করছে না আমেরিকা, দেশটি প্রত্যক্ষভাবেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিমকক্ষ, দুমার স্পিকার এবং মস্কোর একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যাচেস্লাভ ভলোদি ভোলোদিন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ওয়াশিংটন, এর অর্থ দাঁড়ায় যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে জড়িয়েছে আমেরিকা। এক টেলিগ্রাম চ্যানেলে তিনি লেখেন যে, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের সামরিক অভিযানের সমন্বয় করছে ও রসদ যোগাচ্ছে। ফলে সরাসরি তার দেশের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডের অংশগ্রহণ করছে আমেরিকা।ওয়াশিংটন ও ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় সদস্যরা কিয়েভকে ভারী অস্ত্র সরবরাহ করছে যাতে এটি রাশিয়ান আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি হামলা প্রতিহত করতেও পেরেছে ইউক্রেন। ফলে পূর্ব এবং দক্ষিণ ইউক্রেনের কিছু অংশ রাশিয়া নিয়ন্ত্রণে নিলেও কিয়েভ দখলে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ নয়, সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে ব্রিটিশ সেনাও!: ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় লাভিভ এলাকায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্তত ২০ সদস্য দুইটি গ্রুপে ভাগ হয়ে নাশকতা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ তুলেছে রাশিয়া। ইউক্রেনে পশ্চিমা সামরিক সহায়তার অংশ হিসেবে ওই সেনাসদস্যদের গোপনে ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছে। রুশ গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ব্রিটেনের সেনাবাহিনী থেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সদস্যদের ইউক্রেনে পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
এর আগে, ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছিল ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে কিছু ব্রিটিশ সেনা সেখানে রয়েছেন। কিন্তু, রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশিক্ষণ নয় রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনের অঞ্চলগুলোতে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে কাজ করছে ব্রিটিশ এসএএস গ্রুপের বিশেষায়িত সেনা সদস্যরা।

শুধুই কী গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে আমেরিকা!: যদিও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছে ন্যাটো ও আমেরিকা। আমেরিকার কর্মকর্তারা বলছেন, ইউক্রেনকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে আমেরিকা শুধু রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করার বিষয়টি অস্বীকার করছেন তারা।আমেরিকার সঙ্গে টানা এক মাস ধরে উত্তেজনা চলার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় রাশিয়া। প্রসঙ্গত, ইউক্রেন-রাশিয়ার লড়াই গড়িয়েছে তৃতীয় মাসে। এরই মধ্যে বহু মানুষ হতাহতের খবর পাওয়া গেছে দেশটিতে। ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। আমেরিকা একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিলেও থামতে নারাজ পুতিন সরকার। অন্যদিকে হার মানতে রাজি নন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারেও। অধিকাংশ দেশে বেড়েছে সব পণ্যের দাম। ইউক্রেন, রাশিয়া থেকে খাদ্যপণ্য আমদানি করতে না পারায় খাদ্য সংকটও তৈরি হয়েছে কয়েকটি দেশে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে।

ইউক্রেনকে আরও ১৫০ মিলিয়ন ডলার অস্ত্র সহায়তা আমেরিকার: ইউক্রেনে ১৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের আরও অস্ত্র সহায়তা দিতে যাচ্ছে আমেরিকা। দেশটিতে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তিন দশমিক আট বিলিয়ন ডলারের বেশি এমন সহায়তা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। গত শনিবার (৭ মে) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, অস্ত্র সহায়তার প্যাকেজটিতে প্রতিরক্ষা বিভাগের তালিকার অতিরিক্ত অস্ত্র এবং সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অ্যান্টনি ব্লিংকেন আরো বলেন, আমরা ইউক্রেনকে তাদের দেশ এবং তাদের সহ নাগরিকদের কার্যকরভাবে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যাবো।

সামরিক সহায়তা ঘোষণা ব্রিটেনেরও: ইউক্রেনে আরও সামরিক সহায়তা দেবে ব্রিটেন। চলমান যুদ্ধে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশটিকে অতিরিক্ত একশ ৬০ কোটি মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তা দিতে যাচ্ছে দেশটি। এটিকে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ সামরিক সহায়তা বলছে ব্রিটিশ সরকার। এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে হামলায় শুধু ইউক্রেনেই বিপর্যয় ঘটছে না- পুরো ইউরোপের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে। নতুন এ সহায়তায় কী কী থাকছে তা স্পষ্ট করেননি তিনি। গত সপ্তাহে ইউক্রেনের জন্য ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের নতুন একটি সামরিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার মধ্যেই এই খবর দিলেন বরিস জনসন। ওই প্যাকেজে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং একটি কাউন্টার ব্যাটারি রাডার সিস্টেমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইউডি/সুপ্ত

