মেধাবীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিত করুন

মেধাবীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিত করুন

আনিস শিকদার । শুক্রবার, ১৩ মে ২০২২ । আপডেট ১৬:১৫

বিশ্বের সব দেশেই মেধাবীদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটা যে দেশে যত বেশি দেয়া হয়, সে দেশে তত উন্নতি হয়। যেখানে মেধাবীদের অবজ্ঞা করা হয়, সেখানে চরম ক্ষতি হয়। তবুও দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মেধাবীদের যথোচিত মূল্যায়ন না করে কম মেধাবীদের গুরুত্ব দেয়া হয়। যেমন: সরকারি চাকরিতে বিশেষায়িত ক্যাডারের (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ, কৃষিবিদ ইত্যাদি) চেয়ে সাধারণ ক্যাডারের বেতন, পদোন্নতি, মর্যাদা ও প্রভাব বেশি।

দেশের শিক্ষার মান খুবই খারাপ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও তথৈবচ! এর প্রধান কারণ, শিক্ষকের মান খারাপ। শিক্ষকের বেতন, মর্যাদা ও প্রভাব খুব কম। তাই মেধাবীরা শিক্ষকতায় তেমন আসছে না। কিছু এলেও অধিকাংশই সুযোগ পেলে সাধারণ ক্যাডারে চলে যাচ্ছে। দেশের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য চলছে। অনেকেই অসন্তুষ্ট, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্তরায়। তাই আন্তঃক্যাডারের মধ্যে সৃষ্ট বৈষম্য দূর করে সমতা আনতে হবে। পেশাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে বিশ্বখ্যাত পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এবং আরো কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকদিন থেকেই। সর্বোপরি বেতন-সুবিধাদি ও মর্যাদা সর্বাধিক করতে হবে বিশেষায়িত ক্যাডারের লোকদের। এসব যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। নতুবা ডিজিটাল কান্ট্রি বলে খ্যাত দেশে রেলের মতো এনালগ ডিজিটাল হবে সবক্ষেত্রেই।

উল্লেখ্য যে, এবার রোজার ঈদের সময় ট্রেনের টিকেট প্রদানের নিয়ম করা হয়েছিল প্রথমে অনলাইনে বুকিং দিয়ে তার প্রিন্ট কপি নিয়ে স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকেট নিতে হবে। আর এবার কাউন্টারে ভিড় হয়েছে সর্বকালের সর্বাধিক। তাই অনেকেই রাতদিন পালা করে লাইনে থেকে টিকেট নিয়েছে। ফলে ট্রেনযাত্রীদের বহুমুখী হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাই মানুষ একে এনালগ ডিজিটাল নাম দিয়েছে। অথচ নিয়ম মোতাবেক শুধুমাত্র অনলাইনের মাধ্যমে টিকেট দেওয়া হলেই মানুষের এতো ভোগান্তি হতো না। তাই এ ব্যাপারে কঠোর সমালোচনা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এটা হয়েছে। এ ধরনের অবস্থা দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই চলছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সব ওয়েবসাইট দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। দেখা যাবে অধিকাংশই হালনাগাদ নয়। কর্তৃপক্ষের ও বেশিরভাগ জনবলের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এবং কাজের জবাবদিহি না থাকায় এটা হয়েছে। তাই দেশকে বাস্তবিকভাবে ডিজিটাল কান্ট্রিতে পরিণত করতে হলে সরকারি সব জনবলকে প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সকলের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কতিপয় শিক্ষাবিদের অভিমত, সরকারি জনবলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-সুবিধাদি ও মর্যাদা সবচেয়ে সর্বাধিক করতে হবে। বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির শতভাগ আইন বাস্তবায়ন হয়নি। তাই বেশিরভাগ সনদ বেচার কারখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে দেশের উচ্চ শিক্ষার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন হচ্ছে না। তাই সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ইউজিসির শতভাগ আইন পালনে বাধ্য এবং অনার্স ও মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা ইউজিসির মাধ্যমে করতে হবে। তবেই উচ্চ শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন হবে।

এসব না হলে দেশের শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন হবে না। বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও এলডিসি উত্তরণের সংকট মোকাবেলা করার মতো দক্ষ লোক তৈরি হবে না দেশে। সিঙ্গাপুরের সমান উন্নতি করার যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন হবে না। কারণ, সিঙ্গাপুরের সমান উন্নতি করতে হলে সে দেশের শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানের সমান করতে হবে আমাদের দেশের শিক্ষার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান। বর্তমানে সেটা ধারে কাছেও নেই। এবার এশিয়ার সেরা ৬৮৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৪২তম। এটা ছাড়া তালিকার শীর্ষ ২০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও নেই দেশের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। অথচ এ তালিকায় প্রথম ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়। আর তালিকায় সর্বাধিক স্থান পেয়েছে ক্রমান্বয়ে চীন, ভারত ও জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়।

অনেকেই প্রায়ই বলেন, আমরা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি উন্নতি করেছি। কিন্তু কীভাবে? ঐ দু’টি দেশের সমান কি আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান হয়েছে? হয়নি। যার প্রমাণ, কিউএস এর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং-২০২১ মতে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও নাম নেই। অথচ ঐ তালিকায় পাকিস্তানের ১৬টি ও ভারতের ৬৬টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বর্তমানে উন্নতির মাপকাঠি হচ্ছে আধুনিক তথা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার হার এবং তার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান। এসব ক্ষেত্রে যে দেশ যত উন্নতি করছে, সে দেশের উন্নতি তত বেশি ও টেকসই হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি, যার খেসারত চলছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। তাই আধুনিক যুগে দেশের উন্নতির স্বপ্ন দেখলেই শুধু চলবে না, সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য বিশ্বমানের আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার। আর সে জন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চ মেধাবীদের শিক্ষকতায় নিয়োগ করা।

লেখক: সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

mashiurjarif

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading