গান শুনেই বদলে যাচ্ছে ডিমেনশিয়া রোগীদের জীবন
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৪:০০
ভুলে যাওয়ার অন্ধকারে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে স্মৃতি, পরিচিত মানুষ আর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষের কাছে প্রতিদিনই যেন নতুন এক সংগ্রাম। তবে আশার কথা হলো, চিকিৎসার পাশাপাশি এখন সংগীত থেরাপি তাদের জীবনে এনে দিচ্ছে ভিন্ন এক আলো।
পুরোনো দিনের গান, পরিচিত সুর কিংবা প্রিয় কোনো বাদ্যের ধ্বনি অনেক সময় জাগিয়ে তুলছে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি, স্মৃতি আর আবেগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও বিশেষ কর্মসূচিগুলো বলছে, গান শুধু বিনোদন নয়; ডিমেনশিয়া রোগীদের মানসিক স্বস্তি, সামাজিক সংযোগ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ষাটের দশকের শুরুতে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রোব কাউফম্যান। একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে কাঠের মেঝেতে পড়ে যান এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। সেই দুর্ঘটনায় তার মস্তিষ্কে গুরুতর ট্রমাটিক ইনজুরি হয়। দীর্ঘ সময় কোমায় থাকার পর শুরু হয় তার নতুন এক জীবনসংগ্রাম।
রোব কাউফম্যানের স্ত্রী এলেন কাউফম্যান জানান, দুর্ঘটনার পর প্রায় এক মাস তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ নয় সপ্তাহ ধরে স্পিচ থেরাপিসহ নানা ধরনের পুনর্বাসন চিকিৎসা চলে। বর্তমানে তিনি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রম সমস্যায় ভুগছেন।
তবে বিভিন্ন চিকিৎসা ও থেরাপির মধ্যে সংগীত থেরাপিই তার জীবনে সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। কারণ সংগীতের সঙ্গে কাউফম্যানের সম্পর্ক ছিল বহু পুরোনো। তিনি একসময় স্টুডিও সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন এবং কিংবদন্তি গিটারিস্ট জিমি হেন্ডরিক্সের মতো শিল্পীদের সঙ্গেও বাজিয়েছেন।
মানুষের নাম মনে থাকে না? আসল কারণ জানুন
বর্তমানে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিচালিত একটি বিশেষ সংগীত কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নেন কাউফম্যান দম্পতি। সম্প্রতি তারা এই উদ্যোগের দশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পরিবেশনা করে ক্যালিডোর স্ট্রিং কোয়ার্টেট।
সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রায় একশ দর্শক উপস্থিত ছিলেন। সংগীত চলাকালে কেউ চোখ বন্ধ করে তাল মেলাচ্ছিলেন, যেন তিনি নিজেই অর্কেস্ট্রার পরিচালক। আবার কেউ পরিচর্যাকারীর হাতে আঙুল ছুঁইয়ে পিয়ানোর সুর তোলার চেষ্টা করছিলেন। পুরো পরিবেশটাই যেন সংগীতের মাধ্যমে স্মৃতির ভেতর ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।
নিউইয়র্কের আপার ওয়েস্ট সাইডের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান লিংকন সেন্টার প্রথম এই ধরনের উদ্যোগ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মিরান্ডা হফনার বলেন, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে দীর্ঘদিনের অনেক দর্শক ডিমেনশিয়ার কারণে আগের মতো কনসার্টে আসতে পারছেন না কিংবা সদস্যপদ নবায়নও করতে পারছেন না। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডিমেনশিয়া কেন বাড়ছে?
ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়; এটি একাধিক জটিল উপসর্গের সমষ্টি। এতে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে চলাফেরা, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলঝেইমার রোগকে ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণ। তবে আরও নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা থেকেও এই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় এক কোটি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এখনো এ রোগের স্থায়ী কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণেও ডিমেনশিয়ার হার বাড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছে। তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকছেন এবং বয়সজনিত নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
নিউইয়র্ক-প্রেসবিটারিয়ান মেডিকেল সেন্টারের জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ এমিলি ফিঙ্কেলস্টেইনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে-শিল্পকলা, নৃত্য এবং বিশেষ করে সংগীতভিত্তিক থেরাপি স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত মানুষের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে এবং অনেক মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
সংগীত কীভাবে সাহায্য করে?
লিংকন সেন্টারের এই আয়োজনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো-ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিচর্যাকারীরা এখানে বিনামূল্যে অংশ নিতে পারেন।
আয়োজকদের কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজন বুঝে সহযোগিতা করতে পারেন। পুরো অনুষ্ঠানকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে কেউ অস্বস্তি বোধ না করেন।
মিরান্ডা হফনার জানান, অনুষ্ঠানে অনেককে একে অপরের হাত ধরে বসে থাকতে দেখা যায়। কেউ সুরের সঙ্গে পা নাড়ান, কেউ আবার গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। প্রচলিত ধ্রুপদি সংগীতানুষ্ঠানের তুলনায় এখানকার পরিবেশ অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও সহজ।
অনুষ্ঠান শেষে ছোট ছোট কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মিউজিক থেরাপিস্ট ও প্রশিক্ষকেরা অংশগ্রহণকারীদের সংগীতের মাধ্যমে আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করেন। এই উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হলো বয়স্ক মানুষদের নিজেদের পরিচিত পরিবেশে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে সহায়তা করা।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী রোব কাউফম্যান মনে করেন, এসব কনসার্ট তার জীবনকে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক করে তুলেছে। তার স্ত্রী এলেনও মনে করেন, সংগীত তার স্বামীর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।
এলেন বলেন, শুরুতে স্বামীর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। তখন এমন সহায়ক কর্মসূচি খুব বেশি ছিল না। তাই এখনকার এই উদ্যোগগুলোকে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করেন।
কাউফম্যানের ভাষায়, ‘এখানে আসা কারও জীবনই সহজ নয়। অনেক স্ত্রীকে আমি দেখেছি, তারা ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া স্বামীদের পাশে থেকেও হাল ছাড়ছেন না। তারা বাইরে নিয়ে আসছেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখছেন এবং পুরো যাত্রায় সঙ্গ দিচ্ছেন।’
তথ্যসূত্র: এএফপি
ইউডি/রেজা

