এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়
অনিক সরকার । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:২৫
জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, শিক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনে সাফল্য পেয়েছে। লক্ষ্যগুলো অর্জনে ইতিমধ্যে নয়টি সূচকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আরো ১০টি সূচকে অর্জন লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি অর্জন করেছে। এ সাফল্যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক এ ঋণদাতা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ তা কমিয়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে গত এক দশকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে। ২০০০ সালে যেখানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ছয় কোটি ৩০ লাখ, ২০০৫ সালে তা কমে সাড়ে পাঁচ কোটিতে নেমে আসে। ২০১০ সালে তা আরো কমে চার কোটি ৭০ লাখে নেমে এসেছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এ দুটো লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রধানত দুটি কারণে বাংলাদেশ এই সাফল্য অর্জন করেছে। এর একটি হলো মজুরি বৃদ্ধি। সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই শ্রমের মজুরি বেড়েছে গত এক দশকে। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে এসে নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা কমে যাওয়া এই সাফল্যের একটি বড় কারণ। আগে যে পরিবার মাত্র একজন লোকের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই পরিবারে এখন উপার্জনক্ষম লোকের সংখ্যা একাধিক।
এতে বলা হয়, ২০০০ সালে দেশের মোট দরিদ্র মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল। ১০ বছর পর ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এখন এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
আওয়ামী লীগ এবারও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আগামী ২০২১ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের অনুপাত ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এমডিজি অর্জনের প্রথম ধাপ পূরণে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশ পুরস্কৃত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে। ৩৮টি দেশ ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারণ করা মানদণ্ড অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই মানদণ্ড ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া জাতিসংঘের অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। এর আগে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে এমডিজি-৪ অর্জনে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রার এমডিজি-২-এর ক্ষেত্রে ২০১১ সালের মধ্যেই প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে প্রাইমারি স্কুলে পাঠানো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এমডিজি-৩ অর্জনের পথে আছে বাংলাদেশ। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে এমডিজি-৫ আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সফল হবে বলে গত বছর এক ঘোষণায় আশা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
এমডিজিতে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাগুলো অধিকাংশই হয় অর্জিত হয়েছে, না হয় অর্জনের পথে রয়েছে। এর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ২০১০ সালে। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অনন্য সাফল্য অর্জন করায় সেই বছর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এমডিজি অ্যাওয়ার্ড দেয়। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মান উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করায় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, সাউথ সাউথ নিউজ ও জাতিসংঘের আফ্রিকা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কমিশন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। সম্প্রসারিত টিকাদানে সুফল অর্জন করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসা করে। জাতিসংঘ মহাসচিব ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন আর্থসামাজিক অগ্রগতির রোল মডেল। যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও প্রাদুর্ভাব রোধে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের পথে আছে দেশ।
এ প্রসঙ্গে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, জনমুখী নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করছে। তিনি বলেন, এমডিজির ধারণালগ্ন থেকে বাংলাদেশ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং ইতিমধ্যে এমডিজি অর্জনে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলেও এখনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। সঙ্গে সঙ্গে শিশুমৃত্যু হার হ্রাসের ক্ষেত্রেও সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া মাতৃমৃত্যুর হারও তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।
ইউডি/সুস্মিত

