মন্দা মোকাবেলায় পালের হাওয়া আধুনিক কৃষি
কিফায়েত সুস্মিত । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৪৫
নিঃসন্দেহে দিনবদলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষিও বদলে গেছে। কৃষি বলতে এখন আর শুধু ফসল উৎপাদন বোঝায় না। ফসলের উৎপাদনশীলতার উন্নতির পাশাপাশি সবজি, মাছ, মুরগি, গবাদি পশু, ফুল-ফল উৎপাদনে অনেক শিক্ষিত উদ্যমী তরুণ উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছেন। বিদেশে কিছুদিন কাজ করে খানিকটা পুঁজি সংগ্রহ করে অনেক উদ্যমী প্রবাসী এখন বাংলাদেশে ফিরে এসে মাছের চাষ, মাল্টার বাগান, ড্রাগন ফল, ফুলের চাষ, মুরগি, গরুর খামারসহ নানা উদ্যোগ গড়ে তুলছেন।
তাদের দেখাদেখি অন্য শিক্ষিত তরুণরাও নতুন করে কৃষিতে ঝুঁকছেন। তাদের কারণেই কৃষি আজ উদ্যমী উদ্যোক্তাদের কাছে সবচেয়ে আশা-জাগানিয়া এক ভরসার খাত হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের নয়া কৃষির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নীতি-সমর্থনের কথা না বললেই নয়। প্রতিটি বাজেটে তিনি কৃষি খাতে বাড়তি বাজেট বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে যান্ত্রিকীকরণ, পেমেন্ট পদ্ধতি এবং সরবরাহ চ্যানেল ডিজিটাল করার জন্য নানামুখী নীতি-সমর্থন দিয়ে চলেছেন। এই দুর্যোগকালেও তিনি কৃষি ও গ্রামীণ খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন। এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নই এ সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
মানতেই হবে, কৃষিসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তথা কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকরা তার এই জনমুখী নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। তবে তার উন্নয়ন অভিযাত্রা করোনা সংকটের ফলে বেশ খানিকটা ধাক্কা খেয়েছে। তা সত্ত্বেও দুর্যোগ দুঃসময়ে জেগে ওঠার যে ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলার কৌশল গ্রহণ করেছেন, তার সুফল বাংলাদেশ এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে। এ কথা ঠিক যে বিশ্বজুড়েই করোনাকালে জীবন ও জীবিকার নানা সংকট দেখা দিয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট তার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ সংখ্যায় বলেছে, দারিদ্র্য নিরসনে বিশ্ব যে সাফল্য অর্জন করেছিল গত দশকজুড়ে তা করোনা দ্রুতই কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সূত্র ধরে সাময়িকীটি দাবি করেছে যে অতিদরিদ্রের সংখ্যা এ বছর সাত থেকে ১০ কোটি বাড়বে। আর জাতিসংঘ বলছে, মৌলিক আবাসন, পরিষ্কার পানি বা শিশুর বুভুক্ষার মতো সূচকের অবনতিকে এসবের সঙ্গে যোগ করলে এই সংখ্যা ২৪ থেকে ৪৯ কোটি বেড়ে যেতে পারে। এই মহামারি থেকে বাঁচার জন্য উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির ১০ শতাংশ খরচ করতেও দ্বিধা করেনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলো গড়পড়তা ৩ শতাংশ খরচ করেছে এই সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য। গরিব দেশের পক্ষে ১ শতাংশ খরচ করাই মুশকিল হয়ে গেছে।
কৃষি উৎপাদনই কিন্তু শেষকথা নয়। এই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণও কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এই সরবরাহ চেইনের কোনো লুপে অব্যবস্থাপনা বা ঘাটতি দেখা দিলে তা কী করে মেরামত করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতেও ই-কমার্স ব্যবহার বাড়ছে। নতুন স্টার্টআপগুলোকে প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও উৎসাহ দিয়ে আমরা কৃষির সরবরাহ চেইনকে আরো মজবুত করতে পারি। কন্ট্রাক্ট ফার্মিংকে আরো জোরদার করতে পারি। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আরো সহায়তা দিতে পারি। করোনাকালে কৃষির অভূতপূর্ব সহায়তায় আমরা অনেক দেশের চেয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভালো করছি। তাই চর, হাওর, উপকূলসহ সব পর্যায়ের কৃষকদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমরা আমাদের চলার পথকে আরো মসৃণ করতে পারি। আমাদের আধুনিক কৃষির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে মহামারিজনিত মন্দা কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা খুবই সম্ভব।
ইউডি/সুস্মিত

