শিক্ষাক্ষেত্রে স্বপ্নপূরণ: এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ
তৈয়বুর রহমান । মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:৪৫
আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়তে বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক দশকে শিক্ষার সর্বস্তরেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষার এই ব্যাপক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন অর্থনীতির ভিত্তিকেও করেছে মজবুত ও টেকসই, দেশকে বিশ্বের বুকে দিয়েছে পৃথক পরিচিতি। একসময় বিপুলসংখ্যক কোমলমতি শিশু স্কুলে যাওয়ারই সুযোগ পেতো না। অনেকে আবার স্কুলে গেলেও প্রাথমিক পর্যায় থেকে ঝরে পড়তো। পাবলিক পরীক্ষায় ছিল নকলের ছড়াছড়ি। ফল প্রকাশে যেমন দেরি হতো, আবার প্রকাশের পর দেখা যেতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য। স্কুলে যথাসময়ে পাঠ্যবই পেতো না শিশু-কিশোররা। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অসংখ্য তরুণীকে বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে নির্মম জীবন বেছে নিতে হতো। গত কয়েক বছরে বদলে গেছে শিক্ষাক্ষেত্র, পাল্টে গেছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। তাইতো বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্যের তালিকায় শীর্ষে নিঃসন্দেহে শিক্ষা। বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় শিক্ষাবিস্তারে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। শিক্ষার আলোয় এখন আলোকিত পুরো বাংলাদেশ।
নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়
শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক। বাংলাদেশে শিক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিলসে সময় ৮০ শতাংশ নারী ছিল শিক্ষা বঞ্চিত। একসময় নারী শিক্ষা শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। ব্যানবেইসের হিসেবে ২০১২ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫১ শতাংশই ছিল মেয়েশিশু। প্রায় শতভাগ মেয়েই এখন স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এই অর্জনকে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়কর বলে বর্ণনা করছেন। মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ে যে পরিবেশ থাকা দরকার, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিকে শিক্ষকতায় ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক নিয়োগদান করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য বৃত্তি থাকলেও, মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য বৃত্তি রাখা হয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ভেতরে বাংলাদেশ সবার ওপরে অবস্থান করছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
প্রাথমিক শিক্ষায় সাফল্য তাৎপর্যপূর্ণ
দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। নিরক্ষরতা দূরীকরণেও অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। দশ বছর আগে যেখানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা শতভাগ। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির হার ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হার ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। বাংলাদেশে বয়স্ক শিক্ষার হার উন্নীত হয়েছে ৫৯ শতাংশে। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কোর এডুকেশন ফর অল গ্লোবাল মনিটরিং কর্মসূচির আওতায় প্রণীত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন আয় সত্ত্বেও অল্প যে কয়েকটি দেশ জাতীয় বাজেটে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশ সেসব দেশের একটি। প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের শিক্ষার অগ্রগতি আরও জোরদার হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ
সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চলেই বেড়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার হার। মানের দিক থেকেও এগিয়েছে এ পর্যায়ের শিক্ষা। উপবৃত্তির কারণে স্কুলগামী মেয়েশিশুর হার বেড়েছে। স্কুলে খাবার কর্মসূচিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এসব কর্মসূচির ফলে ঝরে পড়া শিশুর হার কমেছে।
মাধ্যমিক স্তরে কমছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশের নারী এখন অন্যদের জন্য উদাহরণ। বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেখানে ৪৯ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই ছাত্রী। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান রিপোর্টে দেশের শিক্ষার উন্নয়নের এই চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ক্রমেই কমছে। ২০০৫ সালে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি, সেখানে এই মুহূর্তে ঝরে পড়ার হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশে।
শিক্ষাখাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি
মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সুযোগ ও সম্পদের প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরে সরকার জাতীয় বাজেটের ১৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে শিক্ষাখাতে। টাকার অঙ্কে যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ১১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৫২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন
শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইউডি/অনিক

