জ্যাক মা: হতদরিদ্র পরিবার থেকে বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫
জ্যাক মা একজন চীনা উদ্যোক্তা, যিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনলাইন পাইকারী ক্রয়-বিক্রয় সাইট আলিবাবা’র প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক সিইও এবং বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান। ২০২২ সালে ফোর্বাস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী জ্যাক মা’র বর্তমান সম্পদের পরিমান ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপুল সম্পদ জ্যাক মা’কে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষদের একজন করেছে। আলিবাবা ডট কম এর কর্ণধার এবং চীনের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি জ্যাক মা’র সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সিস্টেমের উন্নতির ‘তাওবাও মার্কেটপ্লেস’ প্রতিষ্ঠা করেন জ্যাক। এইসব উদ্যোগ সেই সময়ে একটি পত্রিকা তাকে পাগল জ্যাক নামে অভিহিত করেছিল। বর্তমানে তাওবাও মার্কেটপ্লেস বিশ্বের এক নম্বর ই-কমার্স ওয়েবসাইট। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিজিট হওয়া ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে অষ্টম।
সংক্ষেপে জ্যাক মা
জ্যাক মা জনপ্রিয় ট্রেডিং সাইট আলিবাবা ডট কম এর কর্ণধার এবং চীনের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। আলিবাবাতে জ্যাক মা এর ৮% স্টেক আছে এবং পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান আলি পে তে তার স্টেক প্রায় ৫০%।
ইংরেজী শিখতে ৭০ মাইল সাইকেল চালাতেন
তার পুরো নাম জ্যাক মা ইউন। তার জন্ম হয় ১৯৬৪ সালের ১৫ই অক্টোবর, চীনের ঝি-জিয়াং প্রদেশের হ্যাং-চাও শহরে, এক দরিদ্র পরিবারে। তার বাবা-মা ছিলেন পেশাদার গল্প বলিয়ে ও সঙ্গীত শিল্পী। এই পেশায় আয় রোজগার খুব বেশি হত না। দুই ভাই ও এক বোনের মাঝে দ্বিতীয় মা ইউন যে এতবড় বিজনেস ম্যাগনেট হবেন তা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি।
ছোটবেলায় তার প্রথম প্যাশন ছিলো ইংরেজী ভাষা। ঐ বয়সেই জ্যাক মা বুঝে গিয়েছিলেন, অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে ইংরেজী শেখার কোনও বিকল্প নেই। হ্যাং-চাও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আসা ইংরেজী-ভাষী পর্যটকদের ফ্রি গাইড হিসেবে কাজ করতেন জ্যাক মা, ইংরেজী ভাষায় লিসনের বিনিময়ে! জ্যাক মা ৯ বছর ধরে তিনি ৭০ মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে পর্যটকদের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন, শুধুমাত্র ইংরেজী শেখার জন্য!
জ্যাক মা’র শিক্ষাজীবন
ইলন মাস্ক বা বারাক ওবামার মত জ্যাক মা তুখোড় ছাত্র ছিলেন না। চীনে কলেজ ভর্তি পরীক্ষা বছরে মাত্র একবার হত। সব কলেজেই একই সময়ে পরীক্ষা হত, এবং পরীক্ষায় পাশ করে কলেজে সুযোগ পেতে জ্যাক মা’র ৪ বছর লেগেছিল। জ্যাক মা ১৯৮৮ সালে হ্যাং-চাও টিচার্স ইন্সটিটিউট (বর্তমান ‘হ্যাং-চাও নরমাল ইউনিভার্সিটি) এর ইংরেজী বিভাগ থেকে বি.এ ডিগ্রী নিয়ে বের হন। এর পর ২০০৬ সালে বেইজিং এর ‘চিউং-কং গ্রাজুয়েট স্কুল অব বিজনেস’ থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় ডিগ্রী নেন।
জ্যাক মা’র ব্যার্থতা
আলিবাবার আগে জ্যাক মা সত্যিসত্যিই একজন পুরোপুরি ব্যর্থ মানুষ ছিলেন। ৪ বার ফেল করে কলেজে ঢোকার পর, যখন পাশ করে বের হলেন, তখন ব্যর্থতা কাকে বলে, তা তিনি আবারও হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। জ্যাক মা’র জীবন কাহিনীর সবচেয়ে করুণ, কিন্তু শক্তিশালী অংশ এটি। ‘হ্যাং-চাও দিয়ানজি ইউনিভার্সিটি’তে ইংরেজীর লেকচারার হিসেবে যোগ দেয়ার আগে, তিনি ৩০টি চাকরির জন্য চেষ্টা করেন, এবং প্রতিটিতেই ব্যর্থ হন।
ইন্টারনেটের সাথে পরিচয়
জ্যাক মা তার ইংরেজী শিক্ষকের চাকরিটা বেশ উপভোগ করতেন। কিন্তু বেতন ছিল খুবই কম। মাসে মাত্র ১২ ডলার! এই সামান্য বেতনে বলতে গেলে কিছুই করা যায় না। তার উদ্দেশ্য ছিল দারিদ্র থেকে বের হয়ে আসা। এত কষ্ট করে পড়াশুনা করার পেছনেও দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পড়াশুনার পর সম্মানজনক একটা চাকরি পেয়েও তার আর্থিক অবস্থা খারাপই রয়ে গেল।
তার এক সময়ে মনে হল, তিনি তো ইংরেজীর জ্ঞান কাজে লাগিয়েই একটি ব্যবসা শুরু করতে পারেন। ৯০ দশকের একদম শুরুর দিকে তিনি তার অনুবাদ সংস্থা বা ট্রান্সলেশন ফার্ম খুলে বসলেন। অর্থের বিনিময়ে চীনা ভাষা থেকে ইংরেজী এবং ইংরেজী থেকে চীনা ভাষায় বিভিন্ন জিনিস অনুবাদ করতেন। মাঝে মাঝে দোভাষীর কাজও করতেন।
আলিবাবার প্রতিষ্ঠা ও ভাগ্য বদল
১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত জ্যাক মা চীনের বৈদেশিক বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আইটি কোম্পানীর প্রধান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৯ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে জ্যাক মা নিজের শহর হ্যাং-চাও এ ফিরে আসেন এবং ১৮ জন বন্ধু মিলে অনলাইন পাইকারি পন্য বেচাকেনার সাইট আলিবাবা প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন।
আলিবাবা’র নামকরন এর ইতিহাস বলতে গিয়ে, জ্যাক মা বলেছিলেন, “শুরু করার সময়ে আমার মনে হয়েছিল, ইন্টারনেট যেহেতু একটি বৈশ্বিক ব্যাপার, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামটিও বৈশ্বিক হওয়া উচিৎ, সেইসাথে নামটি যেন সহজেই চেনা যায়। সেই সময়ে ‘ইয়াহু’ নামটি ছিল সেরা। আমি অনেক দিন ধরে এমন একটি নাম বের করার চেষ্টা করছিলাম। তারপর হঠাৎ মনে হল আলিবাবা নামটি ভালো হতে পারে। বলতে গেলে সবাই এটা একবারে ধরতে ও মনে রাখতে পারবে, আর নামটা শুরু হয় A দিয়ে”।
১৯৯৯ এর অক্টোবর ও ২০০০ এর জানুয়ারীতে দুইবারে মোট ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট পায় আলিবাবা। তাদের এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল, চীন এর আভ্যন্তরীণ ই-কমার্স মার্কেটকে উন্নত করা। সেই সাথে, চীন দেশের ক্ষূদ্র ও কুটির শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগীতায় এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।
ইউডি/অনিক

