দেশের উন্নয়নে সরাসরি কাজ করছে কৃষিবিদদের গবেষণা
মো. বশিরুল ইসলাম । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৫০
আমাদের দেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ—এ রকম অনেক পেশাজীবী রয়েছেন। এ পেশাজীবীরা দেশের উন্নয়ন, কৃষি, যোগাযোগ, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ, প্রশাসন খাতে কাজ করেন; যার সুফল সাধারণ জনগণ ভোগ করে। আমরা যদি অন্যান্য পেশার সঙ্গে কৃষি পেশাকে তুলনা করি, তাহলে দেখব কৃষিবিদদের গবেষণা সরাসরি দেশ উন্নয়নে কাজ করছে।
সবাই একবাক্যে স্বীকার করবে বর্তমান সময়ে এ দেশের উন্নতির জন্য বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত কৃষিবিদরাই বেশি অবদান রেখেছেন এবং রেখে চলছেন। কৃষিবিদদের হাতেই সৃষ্টি হচ্ছে ফসলের নতুন জাত কিংবা ফসল উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু ফসল কেন, পাশাপাশি গবাদিপশুর উন্নয়ন, দুধের মান ও পরিমাণ বাড়ানো, মাংসের জন্য উন্নত জাতের পশুপালন প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের মাছের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি খামারের বিভিন্ন প্রকার যান্ত্রিকীকরণ কিংবা কৃষির সব ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ- এসবই কৃষিবিদদের হাতের স্পর্শে প্রাণ পায়। এভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় এ দেশের মেরুদণ্ডখ্যাত কৃষকের অর্থনৈতিক অবকাঠামো। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত। কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে দেশ আজ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের জন্য পথিকৃৎ।
ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। কেবল সবজি আর ধানেই নয়; মাছ, ছাগল উৎপাদনেও বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, আমে সপ্তম, আলুতে অষ্টম এবং ফলে দশম। এসব সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ৮৮টি ইনব্রিড ও ছয়টি উচ্চফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের মোট ১০৮টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে এবং দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলছে। এছাড়া বিনা সাফল্যের সঙ্গে উদ্ভাবন করেছে শিম, ডাল ও তেলজাতীয় আটটি ফসলের জন্য জীবাণু সার, যা মাটির গুণাগুণ রক্ষাসহ ডাল ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
দেশের জলবায়ু ও কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৫৪৫টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৫০৫টি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তিসহ মোট ১ হাজার ৫০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ডাল, তৈলবীজ, সবজি, ফলের ১০ হাজারের অধিক কৌলি সম্পদ (জার্মপ্লাজম) জিন ব্যাংকের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছে। পাটজাতীয় ফসলের ৪৫টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার মধ্যে দেশী পাট ২৪টি, তোষা পাট ১৫টি, কেনাফ চারটি ও মেস্তা দুটি। ওই ৪৫টি জাতের মধ্যে বর্তমানে নয়টি দেশী, ছয়টি তোষা, তিনটি কেনাফ এবং দুটি মেস্তা জাতের বীজ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ও আবাদ হচ্ছে। এছাড়া সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৪৬টি জাত অবমুক্ত করেছে। এর বাইরে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো গবেষণা করে বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে।
বর্তমান সরকারের সুপ্রসারিত কৃষিনীতি, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়নসহ কৃষির আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপের কারণে কৃষিতে ঘটছে নীরব বিপ্লব। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। কৃষিতে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে সাধারণ কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফলে। কৃষিবিদরা নিজেদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্যই নিজ নিজ দায়িত্বে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকুক, এগিয়ে যাক আমাদের কৃষি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য রফতানিকারক দেশে পরিণত হোক, কৃষিবিদ দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ইউডি/সুস্মিত

