পরিকল্পনাবিহীন কর্মযজ্ঞ অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ
আব্বাস মজুমদার । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যদি যথাযথভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে সেটির পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট করার হেতু কী, বোধগম্য নয়। এতে বরং সুযোগের অপপ্রয়োগ ঘটে, যার প্রতিকার হওয়া উচিত। জানা গেছে, বিগত এক যুগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৫ হাজার ১২৪ জন ক্যাডার কর্মকর্তা বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এজন্য ‘বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকে শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মূলত এ প্রকল্পের অধীনেই চলছে অপরিকল্পিত এ কর্মযজ্ঞ। এতে প্রশাসনের প্রত্যাশিত মান অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তো উঠছেই; উপরন্তু রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
পরিকল্পনাবিহীন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জনস্বার্থে কতটা কাজে আসছে, এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশ যাওয়ার সুযোগটিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন অনেকেই। যেমন, বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিদেশে মাস্টার্স বা পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই লিয়েনে চাকরির বন্দোবস্ত করে ফেলছেন। পরে আনুষ্ঠানিকতা সারতে নামমাত্র দেশে এলেও অনুমতি নিয়ে পুনরায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন-এমন অনেক নজির রয়েছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেও প্রত্যাগতদের সেই খাতে পদায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কোনো কাজে লাগাতে পারছেন না, তা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশ ও জনগণ কতটুকু লাভবান হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
নগরবিদরা বলছেন, রাজধানী ঢাকা এখন যানজটের মহানগরী হিসেবে পরিচিত। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই মহানগরীতে এখন চলাচল করাই দায়। যানজটের কারণে নিত্য ভোগান্তিতে অস্থির নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়াতে এখন শুরু হয়েছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব। তা কবে শেষ হবে নিশ্চিত করে বলতে পারেন না সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাও। নগর বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা নগরীতে এখন সেবা সংস্থাগুলোও পরিকল্পিতভাবে কাজ করে না। যার যখন প্রয়োজন বা খুশি তখনই রাস্তা কাটে, খোঁড়াখুঁড়ি করে। কোন সমন্বয় নেই। এমনও দেখা যায়, ওয়াসা রাস্তা খুঁড়ে সড়ক মেরামতের পরপরই একই সড়ক খোঁড়া শুরু করে অন্য একটি সেবা প্রতিষ্ঠান। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সড়ক উন্নয়নের কাজটি হয় একেবারেই ধীরগতিতে। কেটে-খুঁড়ে কাজ শেষ করার পর সড়ক মেরামত আর হয় না, পড়ে থাকে দীর্ঘদিন।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সরকারের কোন খাতে কতজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও উচ্চশিক্ষিত জনবল দরকার, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। এমন কী পদ সংক্রান্ত পরিকল্পনাও নেই। এছাড়া প্রশিক্ষণ শেষে কোথায় পদায়ন করা হবে, সে বিষয়েও নেই কোনো বাধ্যবাধকতা। আশঙ্কার বিষয় হলো, এসব ব্যতিরেকেই শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বিষয়ক কার্যক্রম চালাচ্ছে সরকার, যা বাস্তবে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তেমন কাজে আসছে না। অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে উচ্চশিক্ষা শেষে অন্তত পাঁচ বছর দেশে কাজ করার শর্ত দিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে ক্যারিয়ার প্ল্যানিংবিহীন তদবিরনির্ভর বদলি পদায়নের অপধারায় এ ধরনের শর্ত কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বৈকি!
বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ গমন নতুন কিছু নয়। তবে তাদের সেই বিদেশ যাত্রা কতটা ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ হবে এবং এতে সরকারি তহবিলের অপচয় হবে কিনা-প্রকল্প গ্রহণের পূর্বেই তা চিন্তা করা উচিত। দুর্ভাগ্যজনক হলো, সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশে পূর্বে যেসব সমস্যা বিদ্যমান ছিল, তার অধিকাংশ এখনও রয়ে গেছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে সরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পর তা যাতে রাষ্ট্রের জন্য শতভাগ কল্যাণকর হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ প্রেক্ষিতে ‘বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকে শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্প ফলপ্রসূ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক- সাংবাদিক
ইউডি/সুস্মিত

