ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি রোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই
শাহাদাত সরকার । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ১০:২০
বর্ষা মৌসুম আসার আগেই রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এর বাইরেও অনেকে আছেন, যারা বুঝে উঠতে পারছেন না যে তারা ডেঙ্গু আক্রান্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিস মশার বংশ বিস্তার ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে না পারলে রোগটি এবার ভয়াবহ রূপ নেবে। এ বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে বলেও তারা মনে করছেন।
উল্লেখ করা যেতে পারে, জাতীয় ম্যালেরিয়া ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ‘প্রাক মৌসুম এডিস সার্ভে-২০২২’ শীর্ষক জরিপে পাওয়া গেছে, রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড এবার ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ওদিকে রাজধানীর দুই সিটির ৯৮টি ওয়ার্ডের ১১০টি স্থানে ডেঙ্গুর প্রকৃত অবস্থা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সমীক্ষা চালিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। জরিপে উত্তর সিটির ৬৩টি এবং দক্ষিণ সিটির ৯৬টি বাড়িতে এডিস মশা অতিরিক্ত মাত্রায় চিহ্নিত হয়েছে। এটাই যখন বাস্তবতা, তখন আগামী দিনগুলোয় ডেঙ্গু নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এখনো ডেঙ্গুজ্বরের কোনো প্রতিষেধক বের করতে পারেনি সরকার। ডেঙ্গু থেকে রেহাই পেতে হলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আইইডিসিআরের তথ্য মতে, সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। সাধারণত মশক নিধন কার্যক্রমের স্থবিরতা, গাইডলাইনের অভাব এবং মানুষের অসচেতনতাই ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য দায়ী। হঠাৎ থেমে থেমে স্বল্পমেয়াদি বৃষ্টিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা খুব বেশি মাত্রায় প্রজনন সক্ষমতা পায়। ফলে এডিস মশার বিস্তারও ঘটে বেশি। এ মশা যত বেশি হবে ডেঙ্গুর হারও তত বাড়বে। উৎস বন্ধ না করতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে।
২ বছর আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলাকালীন এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। এরপর দুই সিটি মশক নিয়ন্ত্রণে যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সেগুলো ছিল কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটির তেমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে দেখা যায়নি। তবে এ বছর দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধন কাজে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। বাড়িয়েছে এ খাতের বরাদ্দও। দক্ষিণ সিটি মেয়র বলেছেন, দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে করপোরেশনগুলো। প্রথমত বছরব্যাপী, দ্বিতীয়ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনাটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি যাচাই-বাছাই চলছে।
এডিস মশা নির্মূলে উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মার্ক করা ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে অভিযান শুরু করেছে। ডিএনসিসি এলাকায় ১০ দিনের মশা (ডেঙ্গু ও এডিস) নিধন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র আতিক। ১৭ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। আমরা দুই মেয়রের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা পরিচালিত এক জরিপে উত্তর সিটির ৬৩টি এবং দক্ষিণ সিটির ৯৬টি বাড়িতে এডিস মশা অতিরিক্ত মাত্রায় চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি ওয়ার্ডে বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। প্রথমত, ঝুঁকি চিহ্নিত ওয়ার্ডগুলোতে মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এডিস নিধন এবং এডিসের বংশবিস্তার রোধে জোরদার অভিযান পরিচালনা করবে- এ প্রত্যাশা নগরবাসীর।
দেশে ডেঙ্গু চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল, চিকিৎসা সামগ্রীও অপ্রতুল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় লাখ লাখ টাকা খরচ করার পরও আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন অনিশ্চিত থেকে যায়। এ অবস্থায় চিকিৎসার চেয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে বেশি। ২০২২ সালে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা জন্মানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বহুগুণ বেশি। জরিপে আরও উঠে এসেছে, ২০২০ ও ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে বৃষ্টিপূর্ব এডিসের ঘনত্ব বহুগুণ বেশি। ফলে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ সচেতনতা থাকতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
একইসঙ্গে গণমাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতার বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার চালাতে হবে। পরিবার পর্যায়ে মশারির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে দরজা-জানালায় অস্থায়ী নেটও লাগানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময়ে কারও জ্বর হলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা মাথায় রেখেই চিকৎসা করাতে হবে। রক্তসহ যা যা দরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গি যদি কারও একবারের বেশি হয়, তাহলে জ্বরের তীব্রতার সঙ্গে সার্বিক জটিলতা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গু উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, বলা যায় সেখানে ডেঙ্গু একপ্রকার নির্মূলই হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা পারছি না কেন? নিশ্চয়ই আমাদের চেষ্টার কোথাও না কোথাও গলদ রয়েছে। সেই গলদ দূর করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে দুই সিটি করপোরেশনসহ সাধারণ মানুষের সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।
লেখক- কলামিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

