দেশে অবহেলিত মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা সেবা
আবু সুফিয়ান শুভ । শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ । আপডেট ১১:০৫
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়েই একটি আলোচিত শব্দ মানসিক স্বাস্থ্য। নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বেড়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক বা তরুণদের মাঝেই নয়, শিশুদের মাঝেও বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন নানাভাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবের কারণে দেশে এখনো অবহেলিত মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা সেবা।
নানান পেশা ও বয়সের মানুষদের মাঝে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি দেশের কিছু মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে আছে নানান রকমের সঙ্কট। একইসঙ্গে নেই পর্যাপ্ত জনবল। দক্ষ জনবল তৈরিতেও নেই কোনো উদ্যোগ। সর্বোপরি কোনো জোরালো প্রচারণা না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের মাঝেও আছে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। ১৮ হাজার মাকলুকাতের মধ্য মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। মানুষ তার স্ব-বুদ্ধিমত্তার জন্য অন্যান্য জীব থেকে আলাদা। এ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব ও কোনো কোনো কারণে তার বুদ্ধিমত্তা হারিয়ে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে যাদের আমরা পাগল বলে আখ্যায়িত করে থাকি। রিলেশনশিপ এ ব্যর্থতা, প্রিয়জন হারানোর ব্যথা, অতিরিক্ত নেশায় আসক্ত, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ এমন পরিস্থিতে পতিত হয়। মানসিক ভারসাম্যহীনদের সমাজের বোঝাস্বরূপ মনে করা হয়। হাত, পা, শরীর সব স্বাভাবিক মানুষের মতো হলেও তাদের বুদ্ধিমত্তার জন্য তাদের অবস্থান কোনো জঙ্গলের পাশে, রাস্তার ধারে কিংবা রুমের ভেতর শেকলবন্দি। আলাদা পেস্নটে ভাত, তরকারি আছে কি নাই কিংবা না খেয়ে পাড়ি দিতে হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে নানান রকমের বক্তব্য দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাধীনতার পরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্জন মানসিক স্বাস্থ্য আইন- ২০১৮, মানসিক স্বাস্থ্যনীতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের কর্মকৌশল পরিকল্পনা- যা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নেই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ। এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যনীতিতে সমতা ও ন্যায়বিচার, সমন্বিত সেবা, প্রমাণ-ভিত্তিক পরিচর্যা এবং মান নিশ্চিতকরণের বিষয়গুলো রাখার বিষয়ে জানানো হলেও যারা মানসিক চিকিৎসা সেবা দেবেন তাদের পদোন্নতি ও মানোন্নয়ন নিয়েও নেই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ। সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ঝুঁকির মুখে দেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র সরকারি বাজেট বাড়িয়েই নয়, প্রয়োজনে আলাদা ইউনিট গঠন করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ে। একইসঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার দূর করতে চালাতে হবে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা। সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনগণ, প্রবীণ ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। এছাড়াও প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার পাশাপাশি জনগণকে দ্রুত এই পরিষেবা সম্পর্কে অবগত করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানুষ হিসেবে জন্ম নিলে তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। দেশ, সমাজ পরিবারের নিকট দায়বদ্ধতা আছে। দেশে শারীরিক যে কোনো ত্রম্নটির জন্য সহজে আমরা যে কোনো মেডিকেল সেন্টারে যেতে পারি কিন্তু মানসিক সুস্থতার কোনো পরিবেশ না পেয়ে আজ রাস্তার পাশের বন-জঙ্গলের মাঝে, পার্কেসহ বিভিন্ন স্থানে মানসিক ভারসাম্যহীনদের অবস্থান। দেশের সরকার কিংবা দেশের সচেতন নাগরিক কিংবা বিভিন্ন সংস্থার উচিত দেশে শারীরিক চিকিৎসার মতো মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, সেমিনারসহ সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে মানুষকে সচেতন করা। মানসিক ভারসাম্যহীনের সমাজে ন্যূনতম বাঁচার অধিকারটুকু নিশ্চিত করা।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

