মানব অস্তিত্বের স্বার্থেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অপরিহার্য
আরাফাত রহমান । বুধবার, ২৫ মে ২০২২ । আপডেট ১০:০০
জীববৈচিত্র্য উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবসহ পৃথিবীর গোটা জীবসম্ভার সমন্বয়ে গঠিত বাস্তুতন্ত্র। তিনটি বিভিন্ন পর্যায়ে এগুলো বিবেচ্য- বংশানুগত বৈচিত্র্য, প্রজাতি বৈচিত্র্য ও বাস্ততন্ত্রের বৈচিত্র্য। বংশানুগত বৈচিত্র্যের মাত্রা সংখ্যায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। এটি প্রজাতি বৈচিত্র্য অপেক্ষা বহুগুণ অধিক। প্রজাতি পর্যায়ে বৈচিত্র্য সম্পর্কেও সম্পূর্ণ তথ্য জানা যায়নি। বিজ্ঞানীদের নানা হিসাব অনুযায়ী প্রজাতি সংখ্যা এক কোটি থেকে দেড় কোটি। তন্মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ শ্রেণিবিন্যস্ত হয়েছে এবং তাতে আছে প্রায় আড়াই লাখ উদ্ভিদ, সাড়ে সাত লাখ কীটপতঙ্গ, ৪১ হাজার মেরুদণ্ডী, বাকিরা অন্যান্য অমেরুদণ্ডী, ছত্রাক, শৈবাল ও অণুজীব। এখনো অনেক প্রজাতি অনাবিষ্কৃত রয়েছে। এ বৈচিত্র্যের অধিকাংশই রয়েছে পৃথিবীর গ্রীষ্মমণ্ডলে, আর্দ্র-উষ্ণ এলাকায়, বিশেষত বনাঞ্চলে।
১৯২৭ সালের ভারতীয় বন-বিধিতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এতে অবশ্য বনসম্পদের সংজ্ঞা দিতে সব বন্যপ্রাণী এবং চামড়া, দাঁত, শিং, হাড়, রেশম, গুঁটি, মধু, মোম ইত্যাদির উল্লেখ ছিল। ব্রিটিশ আমলে প্রয়োজনবোধে বন্য পাখি ও অন্যান্য প্রাণী, অথবা কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি বিশেষ আইন ও বিধি চালু ছিল। এগুলি হলো- ১. বন্য হাতি সংরক্ষণ আইন, ১৮৭৯; ২. বন্য পাখি ও জন্তু সংরক্ষণ আইন, ১৯১২; এবং ৩. বন্য গন্ডার সংরক্ষণ আইন, ১৯৩২। এসব আইন ছাড়াও ভারতীয় বন-আইন, ১৯২৭ ও অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ সরকারের কাছে বনে শিকার ও মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ন্যস্ত করেছে যা প্রয়োজনবোধে প্রযোজ্য। পরবর্তীকালে ১৯৫৯ সালে সরকার ব্যক্তিগত ও সরকারি বনে এসব কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক দুই প্রস্থ আইন তৈরি করে। এ দুটি বিধি অনুযায়ী বন নিম্নোক্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে- প্রথম শ্রেণি : কোনো বিশেষ প্রজাতির অবলুপ্তি রোধের জন্য কিংবা অভয়ারণ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসব বনে সব ধরনের শিকার, ফাঁদ-পাতা বা মাছ-ধরা নিষিদ্ধ, যতদিন না একটি প্রজাতি বৃদ্ধি পেয়ে অন্যান্য সম্পদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রেণি : এই ধরনের বনে এসব আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বা অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু শিকার, ফাঁদ-পাতা বা মাছ ধরতে পারবে।
এসব আইন বন্যপ্রাণী রক্ষায় ততটা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি। ফলে, বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৩, ১৯৭৩ হিসাবে ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ ১৯৭৩’ জারি করে। অতঃপর ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) বিধি, ১৯৭৪’ হিসেবে ১৯৭৩ সালের এই আইন সংশোধিত, সম্প্রসারিত ও পুনঃবিধিবদ্ধ হয়। সংশোধিত বিধিতে আছে ৪৮ ধারা ও ৩ তফশিল। এতে রয়েছে, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, অভয়ারণ্য, জাতীয় পার্ক ও শিকারভূমি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা; আইনভঙ্গকারীর জন্য জরিমানা ও শাস্তি; বন্যপ্রাণী আমদানি ও রপ্তানি; ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন; সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য; এবং এই আইনের ভিত্তিতে বিধি-বিধান প্রণয়ন। এটি ১৮৭৯, ১৯১২ ও ১৯৩২ সালের আইনগুলোও বাতিল করে। এই তফশিলে বন্যপ্রাণীর একটি তালিকা রয়েছে, তাতে অন্তর্ভুক্ত যেগুলির শিকার অনুমতি সাপেক্ষে বৈধ; যেসব প্রাণী এবং তাদের সংরক্ষণযোগ্য অংশ ও মাংস রাখা, হস্তান্তর ও ব্যবসার জন্য অনুমতিপত্র প্রয়োজন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষ হিসেবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উহার উপাদানসমূহের টেকসই ব্যবহার, জীবসম্পদ ও তদ্সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ব্যবহার হতে প্রাপ্ত সুফলের সুষ্ঠু ও ন্যায্য হিস্যা বণ্টন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাংলাদেশ বন ও বনসম্পদসংশ্লিষ্ট কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন, চুক্তি ও প্রটোকলের স্বাক্ষরদাতা। এগুলোর কোনো কোনোটি অনুমোদিত না হলেও স্বাক্ষরিত হওয়ার সুবাদে এগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পক্ষে ক্ষতিকর সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আমরা প্রকৃতির, প্রকৃতিও আমাদের। সুন্দর এই প্রকৃতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। সে দায়িত্ব শুধু যে জীববৈচিত্র্যের জন্য তা নয়, কেনো না কোনোভাবে মানুষের অস্তিত্বের জন্যই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

